ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির নেতৃত্বাধীন জোট সরকার নির্বাচনী সংস্কার সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীতে হোঁচট খেয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় দেশটির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে গোপন ব্যালটে অনুষ্ঠিত ভোটে মেলোনির দল ব্রাদার্স অব ইতালির (এফডিআই) প্রস্তাবিত সংশোধনীটি ১৮৮-১৮৭ ভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়। এই ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে মেলোনির নিজ দলের বেশ কয়েকজন সাংসদ সংশোধনীটির বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন।
ভোটের পর সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে মেলোনি বলেন, ফলাফলটি 'ইতালীয়দের জন্য একটি হারানো সুযোগ'। তিনি আরও যোগ করেন, 'বিরোধীরা যেভাবে আনন্দোৎসব করছে, যেন তারা বিশ্বকাপ জিতে গেছে—এতে করে বোঝা যায়, তারা নাগরিকদের নিজেদের সংসদীয় প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার অধিকার দিতে চায় না।' তবে পদত্যাগ ও আগাম সাধারণ নির্বাচনের দাবি নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি। বর্তমান সময়সূচি অনুযায়ী ২০২৭ সালের শরতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
প্রস্তাবিত সংস্কার অনুযায়ী ইতালি সম্পূর্ণ আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হতো। এতে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া দল বা জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও বোনাস আসন পেত। পাশাপাশি জোটগুলোকে একটি সাধারণ ইশতেহার ও একক প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হতো—যা অনেক দলের জন্য অস্বস্তিকর ছিল। সংশোধনীটি মূলত 'পছন্দের ভোট' সংক্রান্ত একটি বিধান নিয়ে ছিল, যা ভোটারদের তালিকা থেকে পছন্দের প্রার্থী বেছে নেওয়ার সুযোগ দিত। যদিও এই অংশটি বাতিল হয়েছে, সরকার বাকি সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পারবে।
মেলোনি দাবি করেন, এই সংস্কার ইতালিতে দুর্বল জোট সরকারের প্রবণতা কমিয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনবে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো এটিকে 'কর্তৃত্ববাদী' আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করে যে, এটি আগামী বছরের সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার একটি কৌশল। ২০২২ সাল থেকে মেলোনি ডানপন্থী ও মধ্য-ডানপন্থী দলগুলোর জোট নিয়ে সরকার গঠন করেছেন, যেখানে তার নিজের কট্টর ডানপন্থী এফডিআই সবচেয়ে বড় দল। তবে জোটের অভ্যন্তরে উত্তেজনা বাড়ছে, বিশেষ করে ভোটের আগে ছোট অংশীদারদের আপত্তির কারণে।
অন্যদিকে, মধ্য-বাম ও বামপন্থী বিরোধী দলগুলো মেলোনির বিরুদ্ধে একজোট হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা ইতিমধ্যে বসন্তকালে সরকার-সমর্থিত সাংবিধানিক সংস্কার গণভোটের বিরুদ্ধে সফল অভিযান চালিয়েছে, যা ছিল মেলোনির জন্য প্রথম বড় ধাক্কা। আগামী নির্বাচনে নিরাপদ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে তাকে কেন্দ্র বা আরও চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর দিকে ঝুঁকতে হতে পারে। এর মধ্যে রবার্তো ভান্নাচ্চির নবগঠিত ন্যাশনাল ফিউচার (এফএন) পার্টি উল্লেখযোগ্য। প্রাক্তন প্যারাট্রুপার ভান্নাচ্চি মাত্তেও সালভিনির লীগ পার্টি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এফএন গঠন করেন। এই দলটি ইউরোসংশয়ী, কট্টর ডানপন্থী এবং অভিবাসনবিরোধী নীতি সমর্থন করে। বর্তমানে তাদের জনসমর্থন প্রায় ৬%, যা লীগের ৫.৬% ছাড়িয়ে গেছে।
যদি আগাম নির্বাচন বা মন্ত্রিসভা পুনর্বিন্যাস না হয়, তাহলে ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে মেলোনি ১৯৪৬ সালের পর প্রথম ইতালীয় প্রধানমন্ত্রী হবেন যিনি একটি মাত্র সরকার নিয়ে পুরো মেয়াদ শাসন করবেন। তবে সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পর মেলোনি বলেছেন, পাঁচ বছর পরপর স্বাক্ষরিত চুক্তিটি 'বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে' স্থগিত করা হবে। ট্রাম্পের মন্তব্য যে মেলোনি জি৭ শীর্ষ সম্মেলনে তার সাথে ছবি তোলার জন্য 'ভিক্ষা করেছিলেন'—তা নিয়েও তিক্ততা দেখা দিয়েছে।



