ঘানার রাজধানী আক্রায় অবস্থিত কোয়ামে নকরুমাহ মেমোরিয়াল পার্ক অ্যান্ড মসোলিয়ামে পা রাখলে প্রথমেই চোখে পড়ে আকাশছোঁয়া এক ভাস্কর্য। ধারণা হয়, শুধু দেশেরই নয়, গোটা আফ্রিকার মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে সমান উঁচুতে ঠাঁই পেয়েছেন এই নেতা। গত ২৪ জুলাইয়ের এক অভিজ্ঞতা থেকে জানা গেল, এই স্থাপনা কেবলই কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নয়; এটি একটি জাতির জন্মসনদ, স্বাধীনতার লড়াই এবং এক ব্যক্তির প্রতি অটুট ভক্তির ধারক।
সবুজে বেষ্ঠিত সাদা মার্বেলের পার্কটির কেন্দ্রে পৌঁছানোর পথ তৈরি হয়েছে কংক্রিটে। দুপাশের জলাধারে ঝরনার পানি যেন সুর তুলে নেচে ওঠে। ঠিক সেই পথের শেষ প্রাস্তেই দাঁড়িয়ে নকরুমাহর বিশাল মূর্তি, দেখে মনে হয় তিনি এখনও দিশারি হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে। প্রতিটি দর্শক সঙ্গী পান এক করে গাইড। সেদিনের গাইড অ্যাদজোয়দা ক্লানডি নামের এক তরুণী ধৈর্য ধরে সব দর্শকের ইতিহাস শোনাচ্ছিলেন।
নমকরুমাহর জীবন আর ঘানার স্বাধনের ইতিহাস যেন সমার্থক। ১৯০৯ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ উপনিবেশ গোল্ড কোস্টের এনক্রোফুলে তাঁর জন্ম। শুরু হয়েছিল শিক্ষকতা দিয়ে, পরে যুক্তরাষ্ট্রের লিংকন ইউনিভার্সিটি এবং যুক্তরাজ্যে পুড়াশুনা কালে আফ্রিকার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৪৭ সালে দেশে ফিরে প্রথমে ইউনাইটেড গোল্ড কোস্ট কনভেনশনে যোগ দেন এবং ১৯৪৯ সালে গঠন করেন কনভেনশন পিপলস পার্টি (সিপিপি)। তাঁর মূল ডাক ছিল—‘সেল্ফ গভর্নমেন্ট নাউ’, অর্থাৎ এখনই স্বায়ত্তশাসন চাই। স্বধীনের দাবিকে তিনি রাজনৈতিক অন্দরমহল থেকে সরিয়ে রাজপথে জনগণের কাতারে নিয়ে আসেন।
জাদুঘরের দেয়ালগুলো যেন ইতিহাসের জীবন্ত ক্যানভাস। স্বাধীনতা ঘোষণার সেই পরের দুর্লভ ভিডিও, যা বিবিসি ধারণ করেছিল, দর্শকদের এখনও দেখানো হয়। বিভিন্ন বিশ্বনেতার সাথে নকরুমাহর সাক্ষাতের আলোকচিত্রও সেখানে আছে, যেখানে দেখা যায় প্যাট্রিস লুমুম্বা ও সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকিতা ক্রুশ্চেভের মতো ব্যক্তিত্বকে। জাদুঘরের অধিকাংশ জায়গাতেই আলোকচিত্র ধারণের অনুমতি থাকলেও, একটি বড় কক্ষে সংরক্ষিত তাঁর ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের ঘরে ছবি ও ভিডিও করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কক্ষটি চারটি ভিন্ন রঙে ভাগ করা— হলুদে শৈশব, লালে সংগ্রাম ও রাজনৈতিক উত্থান, নীলে রাষ্ট্রনায়কোচিত সময় এবং কমলায় জীবনের শেষ অধ্যায়ের স্মৃতিচিহ্ন। এই সজ্জা দর্শককে তার জীবনের পথচলা অনুভব করতে সাহায্য করে।
স্বাধীনতার সোনালি অধ্যায়ের বাইরেও নকরুমাহর শাসনামল বিতর্কমুক্ত ছিল না। তিনি দ্রুত শিল্পায়ন, শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নে জোর দিলেও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকে। ১৯৬৪ সালে ঘানা কার্যত একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত হয়। বিরোধীদের দমন ও ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠে। ১৯৬৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, তিনি যখন ভিয়েতনাম ও চীনে রাষ্ট্রীয় সফরে, তখন এক সামরিক অভ্যুত্থানে তাঁর পতন হয়। এরপর আর কখনও দেশে ফেরা হয়নি তাঁর। শেষ জীবন কাটে গিনিতে। ১৯৭২ সালের ২৭ এপ্রিল রোমানিয়ার বুখারেস্টে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। গাইড অ্যাদজোয়া জানালেন, সামরিক সরকার নকরুমাহর স্মৃতি বিলোপ করতে চাইলেও ইতিহাস জয়ী হয়। ১৯৯২ সালে গণতন্ত্র ফিরে আসার পর নতুন করে এই স্মৃতিসৌধ ও জাদুঘর নির্মাণ করা হয় এবং প্রবাস থেকে তাঁর দেহাবশেষ এ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এখানেই এখন শায়িত এই সংগ্রামী, কাছেই তাঁর স্ত্রীরও সমাধি। প্রতিদিন দেশ-বিদেশ থেকে প্রায় এক হাজার দর্শক এটি দেখতে আসেন। সেখানে উগান্ডার দুই পর্যটক ও যুক্তরাষ্ট্রের এক দর্শকের সঙ্গে আলাপে সবার একই বক্তব্য উঠে আসে— এই জাদুঘর না দেখলে ঘানা ভ্রমণ অসম্পূর্ণ রয়ে যেত।




