বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে আজ বাংলাদেশ সময় রাত একটায় আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড। ম্যাচটি নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন ইংলিশ অধিনায়ক হ্যারি কেইন। তার ওপর এক অদ্ভুত আকর্ষণ কাজ করছে—প্রায় এক দশক আগে আর্জেন্টাইন মহানায়ক ডিয়েগো ম্যারাডোনার দেওয়া গোল করার মন্ত্র।

স্মৃতির পাতা উল্টালে দেখা যায়, ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে টটেনহামের অস্থায়ী ঘর ওয়েম্বলিতে লিভারপুলের বিপক্ষে ম্যাচের আগে ঘটেছিল সেই অবিস্মরণীয় ঘটনা। ক্লাব স্টাফরা জানতে পেরেছিলেন, ফিফা দ্য বেস্ট অ্যাওয়ার্ডসের জন্য লন্ডনে এসেছেন ম্যারাডোনা। টটেনহামের কিংবদন্তি ওসি আর্দিলেস ম্যারাডোনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন সাবেক রুমমেট ও তৎকালীন কোচ মরিসিও পচেত্তিনোর সঙ্গে দেখা করার জন্য। নিউয়েলস ওল্ড বয়েজে একসঙ্গে খেলার স্মৃতি নিয়ে আড্ডা জমে ওঠে। এরপর পচেত্তিনো ম্যারাডোনাকে তার দলের অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়কের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চান। সাজঘরে নয়, বরং ড্রেসিংরুমের পেছনের দরজা দিয়ে ডেকে আনা হয় হুগো লরিস ও হ্যারি কেইনকে।

চব্বিশ বছরের তরুণ কেইন ম্যারাডোনার সামনে দাঁড়িয়ে পড়েন কিছুটা আড়ষ্ট। ম্যারাডোনা দুজনকে জড়িয়ে ধরে কেইনকে স্প্যানিশ ভাষায় ‘গলেয়াদর’ বলে সম্বোধন করেন। পচেত্তিনো হেসে অনুবাদ করে দেন—‘গোলদাতা’। বিদায়ের মুহূর্তে ম্যারাডোনা হঠাৎ কেইনের ডান হাত নিজের বাঁ হাতে শক্ত করে চেপে ধরেন। তারপর হাত নেড়ে বলতে থাকেন, ‘সব গোল ওদিকে কোরো না, কিছু গোল করো এদিকে।’ নিজের হাত দিয়ে বাতাসে বলের গতিপথ এঁকে তিনি বিস্ময়ের অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলেন—‘পাম!’ তারপর সেই বিখ্যাত অট্টহাসি। চোখ টিপে পরামর্শ দেন, ‘গোলকিপাররা সারাক্ষণ টেলিভিশনে তোমার খেলা দেখে। তারা জানে তুমি কোথায় মারবে। তাই একটু ছলনা করো। জাস্ট ডু ইট লাইক দিস... টাক!’

সেদিন লিভারপুলের বিপক্ষে ৪-১ জয়ের ম্যাচে দুটি গোল করেছিলেন কেইন। কিন্তু সেগুলো ছিল দূরের পোস্টে। ম্যারাডোনার শেখানো সেই ‘টাক’ কিংবা ‘পাম’ কৌশল কাজে লাগানোর প্রয়োজন হয়নি। ২০২০ সালের নভেম্বরে ম্যারাডোনা পৃথিবী থেকে চলে গেছেন। কিন্তু তার রেখে যাওয়া সেই ছোট্ট পরামর্শ আজও হয়তো অজান্তে বেঁচে আছে কেইনের খেলায়।

বর্তমান বিশ্বকাপে সেমির আগপর্যন্ত ৬ গোল করেছেন ইংলিশ অধিনায়ক। বিশ্লেষকরা বলছেন, আর্জেন্টিনার ডিফেন্সে কিছু ফাঁক রয়েছে। বিশেষ করে সেন্টারব্যাকদের পেছনের জায়গা ও ফুলব্যাকদের ওঠানামার ফলে তৈরি হওয়া ফাঁকা অঞ্চল। এই জায়গাগুলোতেই কেইনের মতো স্ট্রাইকাররা সুযোগ খোঁজেন। সুযোগ পেলে কেইন কী করবেন? গোলকিপার যখন তার শটের দিক আন্দাজ করবে, তখনই কি তিনি চমকে দিয়ে কাছের পোস্টে বল মারবেন? যদি করেন, তা হবে ম্যারাডোনার সেই প্রতিধ্বনি—যিনি অনেক আগেই ইংলিশ স্ট্রাইকারের কানে কানে বলে গিয়েছিলেন, সফল হতে গেলে চমকে দিতে হবে।

আজকের রাত কেইনের জন্য এক পরীক্ষার মঞ্চ। তিনি গোল করবেন কি না, সেটা সময়ই বলবে। কিন্তু যদি কোনো মুহূর্তে তিনি পূর্বানুমানের বদলে বিস্ময় পছন্দ করেন—দূরের পরিবর্তে কাছে শট নেন—তাহলে গ্যালারির অদৃশ্য কোণে হয়তো হাসবেন একজন। ম্যারাডোনা।