কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফির একটি জটিল সমস্যা একই দিনে দুটি ভিন্ন গবেষক দল স্বতন্ত্রভাবে সমাধান করেছে। শুধু তাই নয়, উভয় দলই তাদের প্রমাণের মূল ধারণা বের করে দেওয়ার জন্য একই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির স্নাতক শিক্ষার্থী সেয়ুন রাঘবন এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান্তা বারবারার ডক্টরাল শিক্ষার্থী ইয়াও-টিং লিনের মধ্যে একটি ইমেইল বিনিময়ের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল এক অপ্রত্যাশিত মিলের কাহিনি।
রাঘবন তার বন্ধু লিনকে একটি ইমেইলে কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফির একেবারে নতুন একটি গাণিতিক প্রমাণ পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু লিন তখন তার সুপারভাইজার অধ্যাপক প্রভঞ্জন অনন্তের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ছিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই বৈঠকেই লিন শুনছিলেন একই গাণিতিক প্রমাণের কথা, যা তার বন্ধু ইমেইলে পাঠিয়েছিলেন। বৈঠক শেষ হলে লিন তার বন্ধুকে শুধু একটি বাক্য লিখে জবাব দেন—তারা নিশ্চিতভাবেই এক অদ্ভুত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
এই অদ্ভুত সময়েরই প্রমাণ মিলল পরবর্তীতে। ওই দিনই দুটি আলাদা গবেষণাপত্র arXiv.org-এ জমা পড়ে। একটির লেখক ছিলেন রাঘবন। অন্যটির লেখক ছিলেন অধ্যাপক অনন্ত এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের অধ্যাপক অমিত সাহাই। সবচেয়ে চমকপ্রদ দিকটি ছিল—দুই গবেষণাপত্রেই স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, তাদের প্রমাণের মূল কাঠামো ও ধারণাগুলো তৈরি করে দিয়েছে ওপেনএআইয়ের নতুন মডেল জিপিটি-৫.৬ সল আল্ট্রা।
সমস্যাটি ছিল কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফির একটি বিশেষ শাখা, যাকে বলা হয় আনক্লোনাবল এনক্রিপশন। কোয়ান্টাম তথ্যের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, সাধারণ ডিজিটাল ডেটার মতো এটি হুবহু কপি করা যায় না। এই এনক্রিপশনের উদ্দেশ্য হলো সংবেদনশীল বার্তাকে এমনভাবে গোপন করা, যেন কেউ ডিক্রিপ্ট করার চাবি হাতে পেলেও সেই বার্তাকে দুটি ব্যবহারযোগ্য অংশে বিভক্ত করতে না পারে। ২০১৯ সালে কানাডার অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যান ব্রডবেন্ট এবং তার তৎকালীন ছাত্র সেবাস্টিয়েন লর্ড এই ধারণার একটি আধুনিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছিলেন। পূর্ববর্তী গবেষণায় দেখা গিয়েছিল যে, এই পদ্ধতি সম্ভব হলেও তা কার্যকর ছিল না অথবা নিরাপত্তার জন্য বেশ কিছু অনুমানের ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু নতুন এই দুটি গবেষণাপত্র দাবি করেছে, কোনো শর্ত বা অনুমান ছাড়াই এই এনক্রিপশনের একটি কার্যকর সংস্করণ এখন তৈরি করা সম্ভব।
এই মিলটি পুরোপুরি আকস্মিক নয়। মাসের শুরুতে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলের সাইমন্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য থিওরি অব কম্পিউটিংয়ে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে রাঘবন ও সাহাই দুজনেই উপস্থিত ছিলেন। সেখানেই একটি অমীমাংসিত গাণিতিক সমস্যা সবার সামনে উপস্থাপিত হয়। দুজনেই আলাদাভাবে সমস্যাটি সমাধানের সিদ্ধান্ত নেন। মজার ব্যাপার হলো, তারা দুজনেই একই এআই মডেল ব্যবহার করলেও কাজের পদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
রাঘবন কয়েক বছর আগে এই সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাই সাইমন্স ইনস্টিটিউটের আলোচনায় যখন দেখলেন সমস্যা এখনো অমীমাংসিত, তখন তিনি বিস্মিত হন। যেহেতু তিনি নিজে গবেষণায় এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে কাজ করছিলেন, তাই তিনি জিপিটি-৫.৬ সল আল্ট্রাকে এই কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন। তার পদ্ধতি ছিল বেশ সরাসরি। ওপেনএআইয়ের এই আল্ট্রা সিস্টেমে ডিফল্টভাবে চারটি এআই এজেন্ট একসঙ্গে কাজ করে। রাঘবন সিস্টেমটিকে দুই ঘণ্টার জন্য কাজ করতে দেন। প্রতিটি বিরতির পর তিনি নিজে এআইয়ের অগ্রগতি যাচাই করতেন এবং প্রয়োজনে নতুন নির্দেশনা দিয়ে পথ সংশোধন করতেন। কয়েক ধাপের পর এআই এমন একটি প্রমাণ দাঁড় করায়, যা তার কাছে একদম নির্ভুল মনে হয়। এরপর তিনি এআইয়ের দেওয়া কাঁচা খসড়া গুছিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণাপত্র তৈরি করেন।
অন্যদিকে, অনন্ত ও সাহাই একই এআই মডেল ব্যবহার করলেও তাদের কৌশল ছিল আলাদা। তারা সরাসরি এআইয়ের সঙ্গে ধাপে ধাপে কথা বলার বদলে UCLA-তে তৈরি একটি বিশেষ সিস্টেম ব্যবহার করেন। এই সিস্টেমটি এআই মডেলগুলোকে সম্ভাব্য সমাধান খুঁজতে এবং নিজেরাই সেই সমাধানের সমালোচনা করতে সাহায্য করে। তাদের গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, এআই মডেলটি মূল প্রমাণ ও কাঠামো তৈরি করে দিয়েছে, আর গবেষকেরা কেবল সেটি যাচাই-বাছাই ও পরিমার্জন করেছেন।
সময়ের হিসাব আরও বিস্ময়কর। অনন্ত ও সাহাই প্যাসিফিক সময় সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে arXiv-এ তাদের গবেষণাপত্র জমা দেন। ঠিক তিন ঘণ্টা ১৮ মিনিট পর রাঘবন তার গবেষণাপত্রটি জমা দেন। লিন যখন এই অদ্ভুত মিলটি ধরতে পারেন এবং দুই পক্ষকে যোগাযোগ করিয়ে দেন, তখনো কোনো গবেষণাপত্রই সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হয়নি। পরবর্তীতে তারা দুটি গবেষণাপত্রকে একত্রিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ তৈরির বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
দ্রুত পরিবর্তনশীল বিজ্ঞানের জগতে দুটি দলের একই ফলাফলের দিকে ছুটে চলা নতুন কিছু নয়। কিন্তু দুই পক্ষকে একই গন্তব্যে পৌঁছাতে একই এআইয়ের সাহায্য নেওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম। রাঘবন বলেন, “এই অল্প সময়ের হিসাবটা একেবারে পাগলামি। এই ধারণাটি মাথায় আসার পর থেকে মাত্র দুই সপ্তাহ এক দিন সময় লেগেছে!” অধ্যাপক অনন্ত অবশ্য এই মিল দেখে মোটেও অবাক হননি। তার মতে, এখন বিজ্ঞানীদের সাধারণ মানসিকতা হলো—কেউ কোনো অমীমাংসিত সমস্যার কথা বললেই প্রথমে দেখা হয় জিপিটি এটি সমাধান করতে পারে কি না।
তবে এই ঘটনাটি বিজ্ঞানের জগতে নতুন কিছু দুশ্চিন্তারও জন্ম দিয়েছে। অধ্যাপক ব্রডবেন্ট ফলাফল দেখে সন্তুষ্ট হলেও বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বেশ উদ্বিগ্ন। তিনি জানান, “যে ধরনের কাজগুলো এখন এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে করে দিচ্ছে, সেই কাজগুলো সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর বা পিএইচডি শিক্ষার্থীদের দেওয়া হতো।” অধ্যাপক অনন্তও একই শঙ্কার কথা জানান। তিনি বলেন, “আমি খুশি যে আমার ছাত্রজীবন শেষ হয়েছে। তবে বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য আমি সত্যিই চিন্তিত।” রাঘবন নিজে একজন তৃতীয় বর্ষের পিএইচডি শিক্ষার্থী হয়েও এই অস্থিরতা অনুভব করছেন। তবে তিনি দ্রুত বদলে যাওয়া এই গবেষণার দুনিয়ার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ারই পক্ষপাতী। তিনি বলেন, “আমি এখন যেভাবে গবেষণা করছি, দুই মাস আগেও সেভাবে করতাম না। অনুভূতিটা অদ্ভুত, কিন্তু আপনাকে এর সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে।”
সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান




