মহাশূন্যে মানবসৃষ্ট আবর্জনার পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাতিল স্যাটেলাইট, রকেটের ভগ্নাংশ এবং মহাকাশচারীদের হাতছাড়া ছোট-বড় নাট-বল্টু — এসব মিলিয়ে পৃথিবীর চারপাশে হাজার হাজার টনের ময়লা জমেছে। এই টুকরাগুলো স্থির নয়; প্রতি সেকেন্ডে প্রায় আট কিলোমিটার বেগে পৃথিবীর চারদিকে ঘুরপাক খাচ্ছে। বর্তমানে এক সেন্টিমিটারের বেশি আকারের অন্তত ১২ লাখ বর্জ্যের টুকরা কক্ষপথে ভাসছে, যেগুলোর গতি গুলির চেয়েও কয়েক গুণ বেশি। এমনকি একটি ক্ষুদ্র অংশও যদি চলন্ত কোনো উপগ্রহ বা মহাকাশ স্টেশনে ধাক্কা খায়, তবে সেটি নিমেষেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যেতে পারে। এর ফলে মোবাইল যোগাযোগ, জিপিএস সেবা এবং আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহের ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই ভয়াবহ ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে গবেষকেরা নানা অভিনব পন্থা খুঁজে বের করছেন, যা প্রচলিত ধারণার চেয়ে অনেকটাই অদ্ভুত ও চমকপ্রদ।
জার্মানির বিজ্ঞানীদের একটি দল গিরগিটির পায়ের বিশেষ ক্ষমতা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে নতুন সমাধানের কথা ভাবছেন। গেঁকো গিরগিটি খুব সূক্ষ্ম বৈদ্যুতিক আকর্ষণের সাহায্যে খাড়া পৃষ্ঠে অনায়াসে আটকে থাকতে পারে। গবেষকরা সেই নীতির ভিত্তিতে আঠালো কৃত্রিম চামড়া দিয়ে একটি উপগ্রহ নির্মাণের পরিকল্পনা করছেন। এটি মহাকাশে ভেসে থাকা আবর্জনার গায়ে গিয়ে শক্তভাবে লেগে থাকবে। অন্য একটি ধারণা হলো, আঠালো উপাদানটি একটি দীর্ঘ দড়ির অগ্রভাগে বেঁধে শূন্যে নিক্ষেপ করা। গিরগিটির জিভ যেমন দূরের পোকা ধরে, ঠিক তেমনিভাবে দড়ির মাধ্যমে বর্জ্য আটকে ধরা হবে। এরপর উপগ্রহটি ওই আবর্জনাকে টেনে বায়ুমণ্ডলের দিকে নামিয়ে আনবে, যেখানে বাতাসের ঘর্ষণে তা আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাবে।
ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা ২০২৯ সালের মধ্যে ৫০০ কেজি ওজনের একটি মহাকাশযান পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে চারটি শুঁড়ের মতো রোবোটিক হাত থাকবে, যা অচল হয়ে পড়া ‘প্রোবা-১’ স্যাটেলাইটকে চেপে ধরে নিচে নামিয়ে আনবে। এদিকে যুক্তরাজ্যের সারে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা মহাকাশে ধারালো বর্শা বা হারপুন বসানোর পরীক্ষা চালিয়েছেন। এটি প্রতি সেকেন্ডে ২০ মিটার বেগে ছুটে গিয়ে আবর্জনাকে গেঁথে ফেলবে। একটি কৃত্রিম লক্ষ্যবস্তুতে সফল পরীক্ষা সম্পন্ন হলেও, বাস্তব মহাকাশ বর্জ্য অপসারণে এখনো এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হয়নি।
দূর থেকে ধ্বংসের জন্য লেজার প্রযুক্তিকেও সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ২০১৫ সালে জাপানের গবেষকেরা একটি বিশেষ উপগ্রহের প্রস্তাব দেন, যেখানে ৫ লাখ ওয়াটের শক্তিশালী লেজার বসানো থাকবে। পৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথে ঘুরে ঘুরে এটি আবর্জনা লক্ষ্য করে লেজার মারবে, ফলে টুকরাগুলো ভেঙে ছোট হয়ে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। অন্যদিকে, ২০১১ সালে নাসার বিজ্ঞানীরা ভিন্ন একটি পদ্ধতি উপস্থাপন করেন। তাঁদের মতে, মহাকাশে লেজার না পাঠিয়ে পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকেই শক্তিশালী লেজার ব্যবহার করা সম্ভব। এর সাহায্যে সক্রিয় উপগ্রহের দিকে ধেয়ে আসা বর্জ্যের গতিপথ সামান্য পরিবর্তন করে বড় দুর্ঘটনা এড়ানো যেতে পারে।
ভবিষ্যতের উপগ্রহের জন্য জাপান মহাকাশ সংস্থা ৭০০ মিটার দীর্ঘ একটি বিশেষ পরিবাহী তার তৈরি করছে। উপগ্রহের আয়ুষ্কাল শেষ হলে এই তারটি নিজে থেকেই খুলে যাবে। এরপর পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের টানে উপগ্রহটি ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসবে এবং বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে পুড়ে ধ্বংস হবে। বিশ্বজুড়ে এসব গবেষণা অব্যাহত রয়েছে এবং বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, নতুন এসব পদ্ধতির মাধ্যমে কক্ষপথের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছে সায়েন্স ফোকাস।




