মহাকর্ষের প্রচলিত ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাকর্ষ কোনো রহস্যময় বল নয়, বরং এটি বিশাল ভরের বস্তুর কারণে স্থান-কালের জ্যামিতিক গঠনের পরিবর্তন বা বক্রতা। এই বক্রতা বোঝার আগে চতুর্থ মাত্রা এবং নন-ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির ধারণা পরিষ্কার করা জরুরি। পোলিশ গণিতবিদ হারম্যান মিনকভস্কি আপেক্ষিকতা তত্ত্বকে চার মাত্রার স্থান-কালের সাহায্যে ব্যাখ্যা করেছিলেন, যিনি আইনস্টাইনের শিক্ষকও ছিলেন।

জ্যামিতির ভাষায়, একটি বিন্দুর কোনো মাত্রা নেই; তাকে টানলে একমাত্রিক রেখা তৈরি হয়। রেখাকে আড়াআড়িভাবে টানলে তৈরি হয় দ্বিমাত্রিক সমতল, আর তাকে ওপরের দিকে টানলে পাওয়া যায় ত্রিমাত্রিক স্থান। গণিতবিদেরা কল্পনায় ত্রিমাত্রিক স্থানকে তার সমকোণে টেনে চার মাত্রার ইউক্লিডিয়ান স্পেস তৈরি করতে পারেন, এমনকি পাঁচ বা তার বেশি মাত্রার স্থানও সম্ভব। ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির একটি বিখ্যাত স্বীকার্য হলো সমান্তরাল স্বীকার্য, যা শুধুমাত্র সমতল পৃষ্ঠে প্রযোজ্য। এর বিপরীতে, নন-ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতিতে এই স্বীকার্য বাতিল করে নতুন নিয়ম ব্যবহার করা হয়।

নন-ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির দুটি প্রধান রূপ রয়েছে: উপবৃত্তাকার এবং অধিবৃত্তাকার। উপবৃত্তাকার জ্যামিতিতে, যেমন গোলকের পৃষ্ঠে, কোনো রেখার বাইরের বিন্দু দিয়ে তার সমান্তরাল রেখা আঁকা যায় না; সেখানে ধনাত্মক বক্রতা থাকে এবং স্থান সসীম। অন্যদিকে, অধিবৃত্তাকার জ্যামিতিতে, ঘোড়ার স্যাডেলের মতো আকৃতিতে, একটি রেখার বাইরের বিন্দু দিয়ে অসংখ্য সমান্তরাল রেখা আঁকা যায়; এতে ঋণাত্মক বক্রতা থাকে এবং স্থান অসীম। এই দুই ধরনের বক্রতাই ধ্রুব, তবে আইনস্টাইনের তত্ত্বের জন্য দরকার ছিল জেনারেল রিমানিয়ান জ্যামিতি, যেখানে স্থান-কালের বক্রতা একেক জায়গায় একেক রকম হতে পারে। আইনস্টাইন সময়কে চতুর্থ মাত্রা হিসেবে ধরে নিয়ে এই জ্যামিতির সাহায্যে মহাকর্ষের নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করান।

স্থান-কালের ধারণা সহজ করতে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ধরা যাক, কেউ সন্ধ্যা সাতটায় বাড়ি থেকে বের হয়ে ৩ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং ৪ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত একটি রেস্তোরাঁয় ১০ মিনিটে পৌঁছালেন। দ্বিমাত্রিক মানচিত্রে দূরত্ব হবে ৫ কিলোমিটার (পিথাগোরাসের সূত্র অনুযায়ী), কিন্তু তিন মাত্রার গ্রাফে সময়ের অক্ষ যোগ করলে যাত্রার শুরু ও শেষ বিন্দুর মধ্যে একটি সরল রেখা টানা যায়। এই সরল রেখাটি আসল পথ নয়, বরং স্থান-কালের দূরত্বের মাপ। আসল পথ, যা বাঁক, ট্রাফিক সিগন্যালের কারণে আঁকাবাঁকা, তাকে বলা হয় বিশ্বরেখা (ওয়ার্ল্ড লাইন)। আমাদের ত্রিমাত্রিক জগতের ঘটনাগুলোকে সময়ের সঙ্গে যোগ করে চার মাত্রার গ্রাফ কাগজে আঁকা অসম্ভব, তবে গণিতের সাহায্যে তা করা যায়।

কল্পনায় একজন অতি-বিজ্ঞানী, যিনি চার মাত্রার গ্রাফ আঁকতে পারেন, মহাকাশযানের যাত্রাপথকে একটি বাঁকা রেখা হিসেবে দেখবেন। কারণ, গতি বা ত্বরণের কারণে পথটি কখনো সোজা হয় না। স্থান-কালের এই চার মাত্রার কাঠামোতে কোনো বস্তু স্থির থাকলেও সময়ের মাত্রা বরাবর ভ্রমণ করে। সুষম গতিতে চললে বিশ্বরেখা সোজা কিন্তু সময়ের অক্ষের সমান্তরাল নয়, আর ত্বরণ থাকলে তা বাঁকা হয়। মিনকভস্কির এই গ্রাফ মহাবিশ্বের একটি স্থির ছবি মনে হলেও, এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যৎ নির্ধারিত। এটি কোনো বস্তুর গতিকে বোঝানোর একটি সুবিধাজনক উপায় মাত্র।

এই ধারণা থেকে লরেন্টজ-ফিটজেরাল্ড সংকোচনকে নতুন দৃষ্টিকোণে দেখা যায়। দুটি মহাকাশযান যখন আপেক্ষিক গতিতে পাশ দিয়ে যায়, তখন প্রত্যেকে অপরটির দৈর্ঘ্য ও সময়ের পরিবর্তন লক্ষ্য করে। এর কারণ, স্থান ও সময় পরম নয়; এরা একটি চার মাত্রার স্থান-কালের বস্তুর ছায়ার মতো। আলোর সামনে বই ঘোরালে যেমন তার ছায়ার আকার বদলায়, তেমনি পর্যবেক্ষকের গতির কারণে স্থান-কালে বস্তুর ত্রিমাত্রিক ছায়া পরিবর্তিত হয়। তবে মূল চার মাত্রার কাঠামোটি অপরিবর্তনীয় থাকে। আইনস্টাইনের তত্ত্বে স্থান-কালের ভেতরে দুটি ঘটনার মধ্যকার চার মাত্রার দূরত্বই পরম, যা সব পর্যবেক্ষকের কাছে একই।

আইনস্টাইনের মতে, বিশাল ভরের বস্তু তার চারপাশের স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দেয়, আর এই বাঁকা স্থানে বস্তুগুলো তাদের সবচেয়ে সোজা পথ, অর্থাৎ জিওডেসিক ধরে চলে। ত্রিমাত্রিক স্থানে এই পথটিকে বাঁকা মনে হয়। যেমন, সূর্যের ভারে স্থান-কালের বক্রতার কারণে পৃথিবী উপবৃত্তাকার পথে ঘোরে, যা আসলে স্থান-কালের জিওডেসিক। ত্রিপলির মাঝখানে ভারী তরমুজ রাখলে যেমন চাদর দেবে যায় এবং মার্বেল গড়িয়ে তরমুজের দিকে যায়, তেমনি সূর্যের ভারে স্থান-কালের বক্রতাই গ্রহগুলোর গতিপথ নির্ধারণ করে। এই বাঁকা পথে চলতে বস্তুর সবচেয়ে বেশি নিজস্ব সময় লাগে, যা দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল 'মহাজাগতিক অলসতার নিয়ম' বলে মজা করে উল্লেখ করেছেন।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ধারণা অনুযায়ী, স্থান-কালের এই বক্রতা আলোর বেগে ছড়িয়ে পড়ে এবং শক্তির ক্ষুদ্র কণা গ্র্যাভিটন দিয়ে তৈরি। ১৯৬৯ সালে জোসেফ ওয়েবার মহাকর্ষীয় বিকিরণ ধরা পড়ার দাবি করলেও পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে তা প্রমাণিত হয়নি। তবে ২০১৫ সালে লাইগো প্রজেক্ট সফলভাবে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করে। গ্র্যাভিটনের অস্তিত্ব এখনো অনুমাননির্ভর। ১৯৩৯ সালে পল ডিরাক তত্ত্ব দেন যে, মহাবিশ্ব প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মহাকর্ষ বল দুর্বল হয়ে পড়ছে, যার ফলে পৃথিবী, চাঁদ ও অন্যান্য গ্রহের ভূত্বকে ফাটল ধরতে পারে এবং মহাদেশগুলোর সরণ হতে পারে। আপেক্ষিকতা তত্ত্ব মহাকর্ষের নতুন ব্যাখ্যা দিলেও, মহাকর্ষ ও বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় বলের সম্পর্ক এখনো অজানা। বিজ্ঞানীরা একটি একীভূত ক্ষেত্রতত্ত্ব বা 'থিওরি অব এভরিথিং' প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন, যা প্রকৃতির সব মৌলিক বলকে এক সমীকরণে আনবে।