সাভারের বিরুলিয়ায় গড়ে ওঠা ড্যাফোডিল স্মার্ট সিটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ শিক্ষানগরী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। পিচঢালা চওড়া রাস্তা, চোখজুড়ানো সবুজ আর আধুনিক স্থাপত্যের মেলবন্ধনে তৈরি এই ক্যাম্পাসে তরুণদের কোলাহল ও স্বপ্নের গুঞ্জন শোনা যায়। অভিভাবক আমিনুল ইসলাম জানান, সন্তানের জন্য দেশের অনেক ক্যাম্পাস ঘুরে দেখেছেন তিনি, কিন্তু ডিআইইউর মতো গোছানো ও নিরাপদ পরিবেশ আর কোথাও দেখেননি। এখানে মেধাবীদের জন্য ৩৬টি ক্যাটাগরিতে স্কলারশিপ এবং ১ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে টিউশন ফি মওকুফের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য গ্রুপ লাইফ ইনস্যুরেন্স চালু রয়েছে, যার মাধ্যমে ইতিমধ্যে ৫ শতাধিক পরিবারকে ১৫ কোটি টাকার বেশি বিমা দাবি পরিশোধ করা হয়েছে।

ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সম্পূর্ণ ক্যাশলেস ব্যবস্থা। শিক্ষার্থীরা ‘ওয়ান কার্ড’ ও বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে সব লেনদেন সম্পন্ন করেন। যাতায়াতের জন্য শতাধিক লাল-সবুজ বাস এবং আবাসিক সুবিধার জন্য ৫টি হলের ৯টি আধুনিক ভবন রয়েছে। অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, ক্যাম্পাসের নান্দনিকতা ধরে রাখার প্রধান কারণ শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল আচরণ। ৭০ হাজার বর্গফুটের লাইব্রেরিতে প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার ৩৬৭টি বই ও ই-রিসোর্স সংরক্ষিত আছে। ২০১০ সাল থেকে ‘ওয়ান স্টুডেন্ট ওয়ান ল্যাপটপ’ প্রকল্পের আওতায় শিক্ষার্থীরা ল্যাপটপ পাচ্ছেন। সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী রাফিদ মুহতাদি মাহমুদ জানান, প্রথাগত বিষয়ের বাইরে রিয়েল এস্টেট, ইনোভেশন অ্যান্ড এন্টারপ্রেনিউরশিপ, মাল্টিমিডিয়া অ্যান্ড ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, রোবটিকস ও ফিশারিজের মতো আধুনিক বিভাগ রয়েছে। ১৬০টি ল্যাবরেটরি ও ১৭টি গবেষণাগারে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ মেলে।

টেকসই উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিভিন্ন ভবনের ছাদে ৩.৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন রুফটপ সোলার বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হয়েছে। প্যারামাউন্ট সোলার লিমিটেডের সঙ্গে যৌথভাবে এই প্রকল্প সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ নিশ্চিত করছে এবং প্রকৌশল ও পরিবেশবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘লাইভ লার্নিং ল্যাব’ হিসেবে কাজ করছে।

কর্মসংস্থানের দিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (সিডিসি) ‘এমপ্লয়বিলিটি-৩৬০ ডিগ্রি’ মডেল পরিচালনা করে। ৫০০টির বেশি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গত দুই বছরে এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর চাকরি ও ইন্টার্নশিপ নিশ্চিত হয়েছে। স্টার্টআপ মার্কেট ও ‘লার্ন অ্যান্ড আর্ন’ প্রকল্পের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ২ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠেছেন। উপ-উপাচার্য মুহাম্মদ মাসুম ইকবাল বলেন, বৈশ্বিক ও স্থানীয় কর্মসংস্থানের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমান ফোকাস দেওয়া হয়। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা ছড়িয়ে আছেন এবং ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া কোলাবোরেশন সর্বোচ্চ উৎসাহিত করা হয়।

বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে ডিআইইউর সাফল্য উল্লেখযোগ্য। টাইমস হায়ার এডুকেশন সাসটেইনেবিলিটি ইমপ্যাক্ট রেটিংস ২০২৬-এ বাংলাদেশের শীর্ষস্থান ও বিশ্বের সেরা ১০০ টেকসই বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান পেয়েছে। ইউএস নিউজ বেস্ট গ্লোবাল ইউনিভার্সিটিজ র্যাংকিং ২০২৬-২৭-এ এশিয়ায় ৩৬৬তম ও বিশ্বে ১ হাজার ৬১তম অবস্থান, কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংস ২০২৭-এ ১০০১-১২০০ ব্যান্ডে অবস্থান এবং টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং ২০২৫-এ দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যৌথভাবে প্রথম স্থান অর্জন করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ‘ডিআইইউ আরএকে’ ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবস্থান সুদৃঢ় হয়েছে। বিশ্বের ৬৯০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একাডেমিক নেটওয়ার্ক এবং ৫৫টির বেশি বৈশ্বিক সদস্যপদ রয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ২ হাজার ৬০৩ শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে অংশ নিয়েছেন। উপাচার্য এম আর কবির জানান, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এবং বিশ্বের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কোলাবোরেশনে যাওয়ার মাধ্যমে এই অবস্থানে আসা সম্ভব হয়েছে।

সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে ‘ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেস’-এর মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত প্রায় ৯৬ শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে শিক্ষা ও পুষ্টি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। নিয়মিত আন্তবিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়া আয়োজনও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া-সক্ষমতার প্রমাণ। ডিআইইউ কর্তৃপক্ষের মতে, আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি ও শক্তিশালী নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক মানের যোগ্য করে তোলাই মূল লক্ষ্য। স্মার্ট ক্যাম্পাস থেকে গ্র্যাজুয়েটরা বাস্তব অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন, যা তাত্ত্বিক বিদ্যার পাশাপাশি হাতে-কলমে শেখার সংস্কৃতিকে তুলে ধরে।