কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের বর্তমান সমৃদ্ধি প্রকৃত অর্থে গ্রাহক চাহিদা থেকে আসছে না, বরং বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে বলে মন্তব্য করেছেন অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ টরস্টেন স্লক। সম্প্রতি প্রকাশিত এক ব্লগ পোস্টে তিনি এআই মূল্য শৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরের মুনাফার চিত্র তুলে ধরে এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এআই শিল্পের সবচেয়ে লাভজনক অংশটি নির্ভর করছে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশটির ওপর, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
স্লক এআই কোম্পানিগুলোকে চারটি ভাগে বিভক্ত করেছেন — মডেল ও অ্যাপ্লিকেশন, ক্লাউড ও কম্পিউট, শক্তি ও গ্রিড, এবং সিলিকন ও যন্ত্রপাতি। পিচবুক ও ব্লুমবার্গের তথ্য ব্যবহার করে তিনি দেখিয়েছেন, সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন এনভিডিয়া, এএমডি, মাইক্রন) মুনাফার হার সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৪১ শতাংশ। অন্যদিকে, মডেল ও অ্যাপ্লিকেশন তৈরির সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক) ৫৯ শতাংশ নেতিবাচক অপারেটিং মার্জিনে পরিচালিত হচ্ছে। এই বৈষম্যের কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, এআই খাতে বিনিয়োগের অর্থ মূলত শেষ পর্যায়ের গ্রাহকদের কাছ থেকে আসা আয় দিয়ে নয়, বরং শেয়ারবাজারে মূলধন সংগ্রহ করে চলছে।
তার ভাষ্যে, “এআই বুমের মুনাফা বর্তমানে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্জিত নয়, বিনিয়োগকারীদের অর্থে পরিচালিত হচ্ছে।” তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, উচ্চমাত্রার এই মার্জিনগুলো প্রকৃত, তবে সেগুলো শেষপর্যন্ত ক্ষতির মধ্যে থাকা স্তরটির সংগৃহীত মূলধন থেকে পরিশোধ করা হচ্ছে, চাহিদার ভিত্তিতে উৎপন্ন নগদের বিনিময়ে নয়। গোল্ডম্যান শ্যাক্সের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬ সালে এআই বিনিয়োগ এক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, কিন্তু এত বিপুল বিনিয়োগের পরও অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে স্লক স্পষ্ট করে বলেন, এআই মূল্য শৃঙ্খলের সবচেয়ে লাভজনক অংশটি সবচেয়ে কম লাভজনক অংশটির ওপর নির্ভর করছে — যেটিকে ক্রমাগত রাজস্ব বাড়াতে বা মূলধন সংগ্রহ করতে হবে। কিছুদিনের জন্য মূলধন এই ব্যবধান পূরণ করতে পারে, কিন্তু তা চিরকাল নয়। প্রশ্ন হলো, এআইয়ের চূড়ান্ত গ্রাহকদের কাছে বিনিয়োগের রিটার্ন কি যথেষ্ট দ্রুত পৌঁছাবে, যা এই বিপুল ব্যয় ধরে রাখতে পারবে?
স্লকই একমাত্র অর্থনীতিবিদ নন যিনি এআই খাতের এই অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টস (বিআইএস) তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, প্রধান পাঁচটি হাইপারস্কেলার কোম্পানির বিনিয়োগ তাদের আয় ও নগদ প্রবাহের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত বাড়ছে, ফলে তারা অতিরিক্ত অর্থায়নের জন্য ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে। ব্যাংক অব আমেরিকার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে এই পাঁচটি কোম্পানি ১২১ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ইস্যু করেছে, যা আগের পাঁচ বছরের গড় ঋণের চার গুণ। বিআইএস সতর্ক করে বলেছে, বিনিয়োগে হতাশা দেখা দিলে হঠাৎ করে অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং মূলধনী ব্যয়ের এই বুম দীর্ঘমেয়াদী মন্দায় রূপ নিতে পারে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষক এড জিট্রন এই উদ্বেগকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তিনি অরাকল কর্পোরেশনের উদাহরণ টেনেছেন, যার নেতিবাচক নগদ প্রবাহ ২৩.৭ বিলিয়ন ডলার এবং প্রায় ১৩০ বিলিয়ন ডলারের বকেয়া ঋণ রয়েছে। এছাড়াও এআই অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য তাদের ২৬০ বিলিয়ন ডলারের লিজ দায় রয়েছে। অরাকল ওপেনএআইয়ের সঙ্গে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে, এবং তাদের পুরো ব্যবসার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ওপেনএআই এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারার ওপর। জিট্রনের মতে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যামাজন এবং মেটার মতো কোম্পানিগুলো যদি তাদের বিশাল এআই ব্যয় কমিয়ে দেয়, তাহলে পুরো শিল্পের ভিত নড়ে যেতে পারে।




