বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) সাংস্কৃতিক সংগঠন টিম উৎসব সম্প্রতি ক্যাম্পাসে আয়োজন করে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ‘মেঘ বলছে যাব যাব’। শ্রাবণের শেষভাগে প্রকৃতির সন্ধিক্ষণে—যেখানে বর্ষার মেঘ কখনো বৃষ্টি ঝরাচ্ছে, কখনো সূর্যের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে—এই আয়োজনের মাধ্যমে বর্ষাকে বিদায় জানানো হয়। বাঙালির চিরচেনা বর্ষা, লোকঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তরুণ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার পাশাপাশি ক্যাম্পাসে একটি উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করাই ছিল এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিল ‘মেঘের মঞ্চ’। এখানে শিক্ষার্থীরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বর্ষাবিষয়ক গানের পাশাপাশি লোকজ সুর এবং নিজেদের মৌলিক পরিবেশনা উপস্থাপন করেন। গানের সুরে ও নৃত্যের তালে বর্ষার নানা রূপ ফুটে ওঠে। কখনো কবিতা আবৃত্তি, কখনো আড্ডায় হারিয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতিও এই মঞ্চে স্থান পায়। সন্ধ্যাটি পরিণত হয় সংস্কৃতির এক বর্ণিল মিলনমেলায়, যেখানে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটে। সবাই যেন নিজ নিজ জায়গা থেকে সরে এসে একসঙ্গে তাঁদের অনুভূতি উদ্যাপন করেন—এই ভাবনাই মঞ্চের সাজসজ্জায় প্রতিফলিত হয়।
আধুনিকতার দ্রুত পরিবর্তনের কারণে লোকঐতিহ্যের বহু উপাদান মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে। এ ধরনের আয়োজন ঐতিহ্যকে স্মরণ ও উদ্যাপনের পাশাপাশি তা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য—যেখানে একেক অঞ্চলের খাবার, কারুশিল্প ও পণ্যের আলাদা ঐতিহ্য রয়েছে—সেই বৈচিত্র্যকে তুলে ধরতে অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জিআই পণ্য ও বৈচিত্র্যময় স্টল প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়।
বর্ষার সঙ্গে কাগজের নৌকার সম্পর্ক বাঙালির শৈশবেরই একটি অংশ। বৃষ্টির পানিতে কাগজের নৌকা ভাসানোর সেই ছোট্টবেলার আনন্দ আজও অনেকের স্মৃতিতে জীবন্ত। শিক্ষার্থীদের শৈশবের সেই সোনালি দিনগুলো ফিরিয়ে আনতে ছিল বিশেষ আয়োজন। যেখানে আনন্দের জন্য বড় কোনো ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল না—কেবল বৃষ্টির পানিতে নৌকা ভাসানোই যথেষ্ট ছিল—সেই সরল অনুভূতিকে পুনরুজ্জীবিত করা হয় এই অনুষ্ঠানে। শিক্ষার্থীরা ফিরে যান তাঁদের শৈশবের সেই দিনগুলোতে, যেখানে সুখ–দুঃখের আলাপনের চেয়ে সরল আনন্দই ছিল মুখ্য।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনার পাশাপাশি ছিল বিনোদনের নানা আয়োজন। বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিয়ে আকর্ষণীয় পুরস্কার জেতার সুযোগও রাখা হয়। ক্যাম্পাসের ব্যস্ততা, ক্লাস ও পরীক্ষার চাপের একঘেয়েমি কাটিয়ে তুলতে এমন অনুষ্ঠান শিক্ষার্থীদের জন্য হয়ে ওঠে আনন্দ ও স্বস্তির উপলক্ষ। খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, ক্যাম্পাসে কখন এ ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন হবে—সে আশা নিয়ে তিনি থাকেন। তাঁর মতে, এগুলো একঘেয়েমি কাটানোর পাশাপাশি সবার মধ্যে একটি উৎসবের আমেজ তৈরি করে, যা দৈনন্দিন পড়াশোনার চাপ কমাতে অনেক সাহায্য করে। তিনি টিম উৎসবকে ধন্যবাদ জানান এত সুন্দর একটি আয়োজনের জন্য।
টিম উৎসবের সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ বলেন, বাকৃবিতে বিভিন্ন বহির্ভূত কার্যক্রম কমে যাচ্ছে। তাঁরা সেগুলো পুনরুত্থান করতে চান। পড়ালেখাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কার্যক্রম হলে শিক্ষার্থীরা তাদের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগাতে পারবেন। নবীন শিক্ষার্থীরাও এতে উৎসাহ পাবেন বলে তিনি মনে করেন।
আয়োজনের নামকরণ সম্পর্কে টিম উৎসবের সাধারণ সম্পাদক যাহ্’রা তাসনীম আদিবা ব্যাখ্যা করেন, রবীন্দ্রনাথের একটি বিখ্যাত লাইনকে সামান্য পরিমার্জনা করে এই নাম রাখা হয়েছে। শ্রাবণ প্রায় বিদায় নিচ্ছে—এই ভাবনা থেকেই নামকরণের সিদ্ধান্ত। তিনি আরও জানান, বর্তমানে ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠানের সংখ্যা কমে এসেছে। তাই একটি ভালো ও উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে। তাঁদের প্রত্যাশা, এই আয়োজনের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে আবারও একটি সুন্দর ও প্রাণবন্ত পরিবেশ সৃষ্টি হবে। প্রথমে শুনলে মনে হতে পারে যে রবীন্দ্রনাথেরই কোনো গানের লাইন—কিন্তু আসলে এটি শ্রাবণের বিদায়ের ভাবনা থেকেই নেওয়া হয়েছে বলে তিনি স্পষ্ট করেন।
মেঘ যখন সত্যিই ‘যাব যাব’ বলে উঠে, তখন তার বিদায়কে বিষণ্নতায় নয়; বরং গান, নাচ, নাটক ও লোকঐতিহ্যের মাধ্যমে আনন্দময় করে তুলল বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরা। লেখক: সাইয়্যেদা গালিবা রুহী, বাকৃবির শিক্ষার্থী।




