শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে না হতেই যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি স্কুলগুলোর একটি বড় অংশ নতুন পথ বেছে নিয়েছে। আগে কথোপকথনমূলক এআই বা চ্যাটবট ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও, এখন অনেক জেলা শ্রেণিকক্ষে এর পরীক্ষামূলক ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে, যাতে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই প্রযুক্তির দুর্বলতা ও ‘হ্যালুসিনেশন’ বা কাল্পনিক তথ্য তৈরির প্রবণতা দেখতে পায়। এআই সাক্ষরতা এখন স্কুল-টু-স্কুল আলোচনার কেন্দ্রে; লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতের এআই-চালিত কর্মক্ষেত্রের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা, কিন্তু একই সঙ্গে তাদের চিন্তাভাবনার দায়ভার চ্যাটবটের হাতে তুলে দেওয়া থেকে বিরত রাখা।

এই ভারসাম্যের গুরুত্ব বোঝাতে চার্লস্টন, দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় এক উচ্চ বিদ্যালয়ের মিলনায়তনে শিক্ষক ও প্রধানরা জড়ো হয়েছিলেন। সেখানে প্রশিক্ষক আমান্ডা বিকারস্টাফ, যিনি ‘এআই ফর এডুকেশন’ নামক সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী, একটি এআই সরঞ্জামকে ‘বিশ্বের মানচিত্র তৈরি করো’ বলে নির্দেশ দেন। পর্দায় ভেসে ওঠা মানচিত্র দেখে উপস্থিতরা অবিশ্বাস ও হাসির মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানান। মালির নাম লেখা হলো ‘মেইল’, মিশরকে চিহ্নিত করা হলো ‘সপথ’ নামে, লিবিয়ার স্থলে লেখা হলো শুধু ‘আফ্রিকা’, আর বহু দেশের নাম ভুল বানানে বা অর্থহীন অক্ষরে পরিণত হলো। বিকারস্টাফ বললেন, যদি কখনো শিক্ষার্থীদের এই সরঞ্জামগুলোর ওপর অন্ধবিশ্বাস ভাঙতে চান, তবে মানচিত্রের এই প্রদর্শনীই যথেষ্ট।

এই প্রদর্শনীর পরিপ্রেক্ষিতে স্পষ্ট হয় যে, এআই সাক্ষরতা কেবল ভালো প্রশ্ন লেখা বা জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের কৌশল শেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সেন্টার ফর ইউনিভার্সাল এডুকেশনের পরিচালক রেবেকা উইন্থ্রপের ভাষায়, ‘ভালো এআই সাক্ষরতায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে কখন এটি ব্যবহার করা উচিত নয়, তা জানাও।’ প্রযুক্তি জায়ান্ট ওপেনএআই, গুগল ও অ্যানথ্রপিক বিদ্যালয়গুলোকে তাদের সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, কিন্তু শিক্ষাবিদদের মধ্যে বাড়ছে একটি ঐকমত্য—শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণাত্মক দক্ষতা ও যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা বেশি জরুরি।

দক্ষিণ ক্যারোলাইনার দ্বিতীয় বৃহত্তম জেলা চার্লস্টন কাউন্টি স্কুল ডিস্ট্রিক্ট—যেখানে প্রায় পঞ্চাশ হাজার শিক্ষার্থী—এই লক্ষ্যে নিজস্ব পথ তৈরি করেছে। উপ-অধীক্ষক লুকাস ক্ল্যাম্পের নেতৃত্বে জেলাটি এক বছর আগে ‘এআই ফর এডুকেশন’ সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে, যারা আগে শিকাগো পাবলিক স্কুলস ও হিউস্টনের জন্য নির্দেশিকা তৈরি করেছে। প্রথম ধাপে জেলা একটি এআই নীতি প্রণয়ন করে, যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মতামত নেওয়া হয়। ছাত্রছাত্রীদের ফোকাস গ্রুপ থেকে জানা যায়, তাদের মধ্যে এআই ব্যবহার ব্যাপক কিন্তু অনির্দেশিত; সবাই স্পষ্ট নিয়ম ও প্রশিক্ষণ চায়। জাতীয় পর্যায়ের গবেষণাও একই কথা বলে—অধিকাংশ কিশোর ও শিক্ষক বিদ্যালয়ের কাজে এআই ব্যবহার করছেন, কিন্তু বেশিরভাগই নিজেরাই শেখার চেষ্টা করছেন; খুব কমই এর কারিগরি কার্যক্রম বা আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে করা ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়াতে স্কুল ও অভিভাবকরা এখন সতর্ক। আসক্তিকর অ্যালগরিদম, তুলনামূলক সংস্কৃতি ও মনোযোগের ঘাটতির মতো সমস্যা থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে এখনই সঠিক দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। চার্লস্টনে দ্বিতীয় ধাপ হিসেবে প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। শিক্ষক ও মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীরা অনলাইন ও সরাসরি প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছেন, যেখানে এআই কীভাবে কাজ করে এবং কীভাবে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, তা শেখানো হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের কোর্সে গবেষণাপত্র তৈরির মতো পরিচিত পরিস্থিতি দেখিয়ে বোঝানো হয় যে, জেনারেটিভ এআই কখনো কখনো ভুল তথ্য, এমনকি কাল্পনিক গবেষণাপত্রও নির্ভুল আত্মবিশ্বাসে উপস্থাপন করতে পারে। কোর্সে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘জেনএআই থেকে পাওয়া যেকোনো তথ্যগত বিষয়, বিশেষ করে আপনার শ্রেণিকাজের জন্য, সর্বদা যাচাই করুন।’

তথ্য গোপনীয়তার বিষয়েও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ব্যক্তিগত তথ্য এআই সরঞ্জামের সঙ্গে ভাগাভাগি না করতে বলা হয়েছে, কারণ কথোপকথন সংরক্ষণ হতে পারে, ডেটা প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হতে পারে এবং সম্ভাব্য ফাঁসের ঝুঁকি থাকতে পারে। উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক রে নওয়ার গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে তার এপি রিসার্চ ক্লাসের জন্য ‘শিক্ষণীয় মুহূর্ত’ নিয়ে ফিরেছেন। তিনি এআইয়ের পক্ষপাত ও কাল্পনিক তথ্যের উদাহরণ দেখিয়ে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আলোচনার সূত্রপাত করতে চান। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই এখন এটি বের করার চেষ্টা করছি—কীভাবে সঠিক ভারসাম্য রাখা যায়, যাতে শিক্ষার্থীদের এআই থেকে দূরে সরিয়ে না দেওয়া হয়, আবার তাদের অন্ধভাবে দৌড়াতেও উৎসাহিত না করা হয়। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে, আপনি শুধু একটি উত্তর পেয়ে থেমে যেতে পারবেন না। আপনাকে বিশ্লেষণাত্মক দক্ষতা ব্যবহার করে আরও গভীরে যেতে হবে।’

অন্যদিকে, রাজ্য পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপের দিক থেকে ইউটাহ অগ্রণী। ২০২৪ সালে রাজ্যের শিক্ষা বোর্ড ম্যাট উইন্টার্সকে এআই শিক্ষা বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়োগ দেয়; এটিই প্রথম কোনো রাজ্যে বিদ্যালয়ে এই প্রযুক্তি তদারকির জন্য পূর্ণকালীন পদ। গত এক বছরে উইন্টার্স ইউটাহের সরকারি স্কুল শিক্ষকদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ—সাত হাজারের বেশি—কে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। রাজ্য আইন অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে সব জেলাকে এআই নীতি প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনারেটিভ এআই ফর এডুকেশন হাবের পরিচালক ক্রিস অ্যাগনিউ বলেন, ‘উপর থেকে একটি স্পষ্ট পদ্ধতি থাকলে বড় পরিবর্তন সামলানো সহজ হয়, কারণ সবাই একই সুরে গাইছে।’

মেইন, পশ্চিম ভার্জিনিয়া ও জর্জিয়াসহ কয়েকটি রাজ্য উইন্টার্সের পদ অনুসরণ করেছে। তবে অন্যান্য রাজ্যে এখনো জেলা ভেদে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি বিদ্যমান। ব্যাপক এআই সাক্ষরতা প্রশিক্ষণের জন্য বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা কম সম্পদসম্পন্ন জেলাগুলোর জন্য উদ্বেগের কারণ। ইউটাহে প্রশিক্ষণের শুরুতেই এআই কীভাবে কাজ করে, তার পক্ষপাত, কাল্পনিক তথ্য, নৈতিক সমস্যা ও ডেটা গোপনীয়তার প্রয়োজনীয়তা শেখানো হয়। এরপর শিক্ষকরা নির্দিষ্ট সরঞ্জামের ওপর অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। ক্যানিয়ন্স স্কুল ডিস্ট্রিক্টের এআই তত্ত্বাবধায়ক এমা মস একটি আটজনের দল নিয়ে রাজ্যজুড়ে ১৫০টির বেশি প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেছেন; এটি স্থানীয় একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর পাঁচ লাখ ডলারের অনুদানে সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম, আমরা আপনার কাছে যাব। আপনি গ্রামীণ এলাকায় হোন বা শহরে, কোনো পার্থক্য নেই।’

রাজ্য পর্যায়ে এআই সরঞ্জাম সংগ্রহেও ইউটাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। উইন্টার্স ডেটা গোপনীয়তার চুক্তি ও ছাড়মূল্যের আলোচনা করে গ্রামীণ ও কম সম্পদসম্পন্ন জেলাগুলোকে প্রবেশাধিকার দিয়েছেন। তিনি নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে সতর্ক করে বলেন, ‘সবাইকে বুঝতে হবে এই প্রযুক্তি কী এবং কীভাবে কাজ করে। এআই সাক্ষরতা কেবল “এআই ব্যবহার করো না” বলার চেয়ে অনেক বড়; এটি ভবিষ্যতের জন্য শিশুদের প্রস্তুত করার বিষয়।’

প্রাপ্তবয়স্কদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনাও জরুরি বলে মনে করেন রাজ্য শিক্ষা বোর্ডের ডিজিটাল প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা ইয়ামাদা। তাঁর মতে, শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের এআই ব্যবহারকে কেবল প্রতারণা হিসেবে দেখার মানসিকতা বদলাতে হবে। তিনি বলেন, ‘প্রতারণা সবসময়ই ছিল। শিক্ষকদের দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের ভাষায় কথা বলা এবং তাদের বোঝানো যে, তারা সব উত্তরের জন্য এআইয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে না।’ ছোট শিশুদের জন্য কথোপকথন হতে পারে, ‘মানুষ মিথ্যা বলতে পারে। একটি প্রোগ্রাম মিথ্যা বলতে পারে। একটি রোবট মিথ্যা বলতে পারে।’ বড়দের জন্য বার্তা ভিন্ন—‘অবশ্যই, আপনি চ্যাটজিপিটি দিয়ে কম্পিউটার কোড লিখতে পারেন। কিন্তু যখন প্রোগ্রামটি কাজ করা বন্ধ করে দেবে, তখন আপনাকে সেটি ঠিক করতে সক্ষম হতে হবে।’

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে ফরচুন ডটকমে প্রকাশিত হয়েছিল। সংবাদটি লিখেছেন জ্যেকার, সান ফ্রান্সিসকো থেকে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের শিক্ষাবিষয়ক প্রতিবেদনের জন্য একাধিক বেসরকারি ফাউন্ডেশন থেকে আর্থিক সহায়তা নেওয়া হয়; সব বিষয়বস্তুর জন্য এপি এককভাবে দায়ী।