ওডিবিএলের প্রকাশনার শতবর্ষ এখনো অব্যাহত। এক শতাব্দী অতিক্রম করার পর এই গ্রন্থের মূল্য নতুনভাবে উপলব্ধি করার সময় এসেছে বলে মনে করছেন ভাষাবিদরা। বাংলা ভাষার ইতিহাস, বিস্তার ও ভৌগোলিক পরিসর বোঝার ক্ষেত্রে এটি আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের উপভাষার বৈশিষ্ট্যকে বর্তমান সময়ের আলোকে বিচার করতে গেলে এই গ্রন্থই অতীত ও বর্তমানের মধ্যে সেতুবন্ধের ভূমিকা পালন করে। ভাষার বিবর্তন, আঞ্চলিক বৈচিত্র্য এবং মানুষের ভাষাব্যবহারের পরিবর্তন বুঝতে এটি এক নির্ভরযোগ্য ‘রেফারেন্স পয়েন্ট’ হিসেবে উপস্থিত। এর ভিত্তিতে উপভাষাতত্ত্বের নতুন প্রশ্ন, ভাষার সামাজিক ব্যবহার এবং বাংলা সমাজভাষাতত্ত্বের সম্ভাবনা নিয়ে আরও গভীর গবেষণার পথ উন্মোচিত হতে পারে। তাই শতবর্ষে ওডিবিএলের মূল্যায়ন বাংলা ভাষাচর্চার বর্তমান ও ভবিষ্যতের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা হতে পারে। এই মন্তব্য করেছেন আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের প্রভাষক সুহৃদ সাদিক।

‘দ্য অরিজিন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অব দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ’—সংক্ষেপে ওডিবিএল—প্রকাশিত হয় ১৯২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘খয়রা অধ্যাপক’ পদে যোগদানের পর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (১৮৯০–১৯৭৭) দীর্ঘ বারো বছরের সাধনায় এই গ্রন্থ সম্পন্ন করেন। ১ হাজার ১৭৯ পৃষ্ঠার এই গবেষণাগ্রন্থ প্রথমে দুটি খণ্ডে পাঁচশ কপি মুদ্রিত হয়, যার মূল্য নির্ধারিত হয় মাত্র বিশ টাকা। পরে ১৯৭১ সালে লন্ডনের অ্যালেন অ্যান্ড আনউইন প্রকাশনী সংযোজক খণ্ডসহ তিন খণ্ডে এর অফসেট পুনর্মুদ্রণ প্রকাশ করে। মুদ্রণের সময় তিনি নিজেই অত্যন্ত যত্নসহকারে প্রুফ সংশোধন করতেন এবং নিয়মিত অধ্যাপনার পাশাপাশি অবসর সময়ের প্রায় পুরোটাই এই কাজে ব্যয় করতেন।

১৮৯০ সালের ২৬ নভেম্বর জন্মগ্রহণকারী সুনীতিকুমার শিক্ষাজীবনের সূচনা করেন মতি শীলের অবৈতনিক বিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে স্কটিশ চার্চ কলেজ ও প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যয়ন শেষে ১৯১১ সালে স্নাতক এবং ১৯১৩ সালে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিশেষ বিষয় হিসেবে জার্মান ভাষাতত্ত্ব এবং প্রাচীন ও মধ্য ইংরেজি ভাষা নির্বাচনের মাধ্যমে তাঁর জ্ঞানজগতের নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়। প্রাচীন ও মধ্য ইংরেজির সঙ্গে গথিক, প্রাচীন উচ্চ জার্মান, নিম্ন জার্মানসহ জার্মানিক ভাষাগুলোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাঁকে এসব ভাষার গভীর অধ্যয়নে উদ্বুদ্ধ করে। ভাষার ইতিহাস, বিবর্তন ও পারস্পরিক সম্পর্কের প্রতি তাঁর আগ্রহ ক্রমে তীব্রতর হতে থাকে। এভাবেই তরুণ সুনীতিকুমারের মনে ভাষাতত্ত্বের প্রতি গভীর অনুরাগ জন্ম নেয়।

এই বৌদ্ধিক পরিবেশেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষাচিন্তার বিকাশ ঘটে। শৈশব থেকেই ভাষার অন্তর্নিহিত রহস্য তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। ব্যুৎপত্তিগত ইতিহাসের চেয়ে ভাষার ব্যবহারিক রূপ, প্রয়োগ ও ভাব প্রকাশের বৈশিষ্ট্য তাঁর কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ‘বাংলা বহুবচন’, ‘সম্বন্ধে-কার’ ও ‘বাংলা উচ্চারণ’ প্রবন্ধে তাঁর এই সূক্ষ্ম ও আধুনিক ভাষাদৃষ্টির পরিচয় স্পষ্ট। আনুমানিক ১৮৭৮–৮০ সালে, অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন সতেরো-আঠারো বছর, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময়েই তিনি একজনকে বাংলা শেখানোর দায়িত্ব নেন। তখন তিনি লক্ষ্য করেন, বাংলা ভাষায় লেখার সময় উচ্চারণের প্রচুর তফাত হয়। এ প্রসঙ্গে তাঁর ‘বাংলা উচ্চারণ’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, বাংলার উচ্চারণের এই বিশৃঙ্খলা নজরে পড়লে তাঁর কৌতূহল জাগে—এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে কোনো নিয়ম আছে কিনা তা জানার ইচ্ছা হয়। তাঁর কাছে তখন খান-দুই বাংলা অভিধান ছিল; মনোযোগ দিয়ে উদাহরণ সংগ্রহ করতে থাকেন এবং পরে একটি নিয়ম বের করার চেষ্টা করেন। ইংল্যান্ডে বাংলা শেখানোর আন্তরিক তাগিদ থেকেই রবীন্দ্রনাথ অজ্ঞাতসারেই ভাষাবিজ্ঞানচর্চায় ব্রতী হন। সুনীতিকুমার রবীন্দ্রনাথের ভাষাচর্চার ব্যাপ্তি দেখে বিস্মিত হয়ে তাঁকে বাংলা ভাষাতত্ত্বের একজন ‘অগ্রণী পথিকৃৎ’ হিসেবে শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছেন। অধ্যাপক পবিত্র সরকারের মতে, বাংলা ধ্বনির উচ্চারণের রহস্যই সর্বপ্রথম রবীন্দ্রনাথকে ভাষার ভিতরকার বিষয়-স্যাপার সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলে।

বাংলা ভাষাতত্ত্বের তাত্ত্বিক চর্চার সূচনা মূলত বিদেশি ভাষাবিদদের হাতেই। এর ধারাবাহিকতায় বাংলা গদ্যের বিকাশ ত্বরান্বিত হয়। ইংরেজ ও পর্তুগিজদের আগমনের আগে এ দেশের মানুষের দৈনন্দিন বৈষয়িক ও জীবনাচরণমূলক কাজেও প্রধানত পদ্যভাষার ওপর নির্ভরশীলতা ছিল। বাস্তব জীবন ও প্রয়োজনের স্বাভাবিক বাহন হিসেবে গদ্যের অপরিহার্য ব্যবহার ও ক্রমোন্নতি বিদেশিদের সক্রিয় হস্তক্ষেপের পরেই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ধর্ম প্রচার ও বৈষয়িক স্বার্থসাধনের উদ্দেশ্যে ইংরেজ-পর্তুগিজরা এ দেশে এলেও নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণে তাদের বাংলা ভাষা শেখা এবং ভাষাটির চর্চা ও উন্নয়নে মনোনিবেশ করতে হয়। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে বাংলা ভাষাতত্ত্বের সমৃদ্ধ চর্চা গড়ে ওঠে। এর পেছনে কার্যকর ছিল প্রাচীন ভারতীয় ভাষাতাত্ত্বিক ঐতিহ্য এবং আধুনিক ইউরোপীয় ভাষাবিজ্ঞানের সম্মিলিত প্রভাব। এ দুই ধারার পারস্পরিক টানাপোড়েন বাংলা ভাষাতত্ত্বের বিকাশকে কখনো কখনো বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তও করেছে। বাংলা শব্দ প্রয়োগ ও ব্যাকরণচর্চার ক্ষেত্রে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। উমেশচন্দ্র বটব্যাল, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, ব্যোমকেশ মুস্তাফী, যোগেশচন্দ্র রায় প্রমুখ মনীষীর গবেষণায় এ পরিসর সমৃদ্ধ হয়।

ওডিবিএলের রচনায় ফরাসি ভাষাবিদ জুল ব্লখের ‘ফরমেশন অব মারাঠি’ গ্রন্থের প্রভাব স্পষ্ট। ১৯২০ সালে প্রকাশিত ব্লখের এই গ্রন্থ তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত; সুনীতিকুমার অনেকটা এর আদলেই বাংলা ভাষার একটি বিস্তৃত ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক রূপ নির্মাণ করেন। মারাঠি, গুজরাটি, রাজস্থানি, পাঞ্জাবি, হিন্দি, অসমিয়া, ওডিশি, বিহারি, সিন্ধি, লহন্দি, নেপালি ও সিংহলির সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক ও স্বাতন্ত্র্য নির্ণয়ে ওডিবিএলের দ্বারস্থ না হয়ে উপায় নেই। গ্রন্থটিতে সরাসরি ‘ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাতত্ত্ব’ নামে কোনো পৃথক আলোচনা নেই। তবে বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বিভিন্ন প্রসঙ্গে এ ভাষাতত্ত্বের গভীর প্রয়োগ করেছেন। ভূমিকা অংশে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা ও উপভাষা, বিশেষত কেন্তুম-শতম বিভাজন নিয়ে আলোচনা রয়েছে। সমগ্র গ্রন্থেই ইন্দো-ইউরোপীয় ধ্বনিতত্ত্ব ও রূপতত্ত্বের নানা দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে আছে। এমনকি পরিশিষ্টে কয়েকটি আধুনিক বাংলা বাক্যের ইন্দো-ইউরোপীয় রূপও উপস্থাপিত হয়েছে।

সুনীতিকুমার নিজস্ব ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে ওডিবিএলের বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করেছেন। বাংলা ভাষার প্রতিটি বৈশিষ্ট্যকে তিনি ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে দেখিয়েছেন, কীভাবে সংস্কৃত—বিশেষত বৈদিক ও লৌকিক সংস্কৃতের ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য—মধ্যভারতীয় আর্য ভাষায় বিকশিত হয়ে অপভ্রংশের মাধ্যমে উত্তর ভারতের বিভিন্ন ভাষায়, পশ্চিমের মারাঠি থেকে পূর্বের বাংলা-অসমিয়ায় বিস্তার লাভ করেছে। প্রায় দেড় হাজার বছরব্যাপী মধ্যভারতীয় আর্য ভাষার দীর্ঘ বিবর্তনপর্বে অশোকের অনুশাসনের ভাষা এবং মহারাষ্ট্রী, শৌরসেনী, মাগধী, অর্ধমাগধী, পৈশাচী প্রভৃতি প্রাকৃতের নানা স্তর অতিক্রম করতে হয়েছে। জটিল এই পরিক্রমাকে তিনি বিভিন্ন ভাষার বিশেষ চিহ্ন ও প্রতীক ব্যবহার করে সহজবোধ্য করে তুলেছেন। ভাষার ধ্বনিগত বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে উচ্চারণতত্ত্বের গুরুত্ব তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। বাংলা ‘অ’-কার ও ‘অ্যা’-কারের উচ্চারণকে ঐতিহাসিকভাবে বিচার করে দেখিয়েছেন, কখন ও কীভাবে এগুলোর পরিবর্তন ঘটেছে। মধ্যভারতীয় আর্য ভাষা থেকে অপভ্রংশ এবং প্রত্ন-নব্য ভারতীয় আর্যভাষার পর্যায়ে ধ্বনির ক্রমবিবর্তন ব্যাখ্যায় এ গ্রন্থের তুল্য অন্য গ্রন্থ নেই বলে ভাষাবিদরা মনে করেন।

পরবর্তীকালে ভারতীয় বিভিন্ন ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ নিয়ে রচিত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থে ওডিবিএলের আদর্শ ও পদ্ধতির প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ করা যায়। এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে রয়েছে বাবুরাম সাকসেনার ‘দ্য ইভল্যুশন অব আওধি’ (এলাহাবাদ, ১৯৮৩), কাত্রের ‘দ্য ফরমেশন অব কোঙ্কনি’ (মুম্বাই, ১৯৪২), উদয় নারায়ণ তেওয়ারীর ‘দ্য অরিজিন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অব দ্য ভোজপুরি ল্যাঙ্গুয়েজ’ (কলকাতা, ১৯৬০), সুভদ্রকুমার ঝার ‘দ্য ফরমেশন অব দ্য মৈথিলি ল্যাঙ্গুয়েজ’ (লন্ডন, ১৯৫৪) এবং বাণীকণ্ঠ কাকতীর ‘আসামিজ: ইটস ফরমেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ (গুয়াহাটি, ১৯৪১)। এ ছাড়াও গুজরাটি, রাজস্থানি ও পাঞ্জাবি ভাষা নিয়ে রচিত বহু গবেষণাগ্রন্থে ওডিবিএলের চিন্তাধারা, বিশ্লেষণপদ্ধতি ও গবেষণাদৃষ্টির অনুসরণ পরিলক্ষিত হয়।

প্রায় এক শতাব্দী আগে স্যার উইলিয়াম জোনস সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে ইউরোপীয় ভাষাগুলোর সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়ে যে নবচিন্তার সূচনা করেছিলেন, সুনীতিকুমার তারই এক দীপ্ত উত্তরাধিকার। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাতত্ত্বের গবেষণায় তাঁর অবদান অসামান্য। ১৯২৭ সালে মালয়, বালি, জাভা ও শ্যামদেশ ভ্রমণে তিনি রবীন্দ্রনাথের অন্যতম সঙ্গীও ছিলেন। গ্রন্থটি প্রকাশের পর দুই মনীষীর ঘনিষ্ঠতা আরও গভীর হয়। আজ শতবর্ষে দাঁড়িয়ে ওডিবিএলের মূল্যায়ন কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়, বরং বাংলা ভাষাচর্চার বর্তমান জিজ্ঞাসা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষক সুহৃদ সাদিক।