বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান মুহাইমিনুল ইসলামের জীবনকাহিনি আজ অনেকের জন্যই অনুপ্রেরণা। একসময় যিনি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে ১৬ হাজার টাকা বেতনের সেনাবাহিনীর চাকরিতে বাঁধা ছিলেন, তিনিই এখন ফ্রিল্যান্সিংয়ের বৈশ্বিক বাজারে নিজের নাম লিখিয়েছেন। তাঁর এই অসাধারণ উত্থানের পেছনে রয়েছে অদম্য ইচ্ছাশক্তি, স্ত্রীর অকুণ্ঠ সমর্থন এবং নিরলস পরিশ্রম।
শিক্ষাজীবনে খুলনা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমা প্রকৌশলে ভর্তি হয়েছিলেন মুহাইমিনুল। প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর, কিন্তু পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে তা পূরণ হয়নি। ২০১৮ সালে চতুর্থ সেমিস্টারে পড়াকালীনই সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিনি। ২০১৯ সালে প্রশিক্ষণ শেষে ২০২০ সালে বগুড়ায় কর্মস্থল হয় তাঁর। তবে বাঁধাধরা চাকরিজীবন বেশি দিন সহ্য হয়নি তাঁর। ২০২২ সালের শেষদিকে তিনি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নেন, যা পরিবারের জন্য ছিল বজ্রপাতের মতো।
মুহাইমিনুলের ভাষ্যমতে, তাঁর স্ত্রী ইসরাত জাহান এই সিদ্ধান্তের পিছনে সবচেয়ে বড় প্রেরণা। তিনি জানান, স্ত্রী যদি রাজি না হতেন, তাহলে আজকের এই সাফল্যের গল্প কখনোই লেখা সম্ভব হতো না। চাকরি ছাড়ার পর কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছাড়াই বাড়ি ফিরে আসেন তিনি। প্রথমে ভেবেছিলেন, পড়ালেখা তো মাধ্যমিক পর্যন্তই করেছেন, প্রয়োজনে হোটেলের কাজ করেও জীবন চালাবেন, কিন্তু নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আর কাটাবেন না।
বাড়ি ফেরার কিছুদিন পর এক দুলাভাইয়ের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কথা জানতে পারেন মুহাইমিনুল। কম্পিউটার সম্পর্কে তখন তাঁর জ্ঞান ছিল শূন্যের কোঠায়—এমনকি কম্পিউটার অন করাও জানতেন না। কিন্তু আত্মবিশ্বাস ছিল অটুট। সেনাবাহিনীর চাকরির জমানো টাকা দিয়ে একটি পুরোনো ল্যাপটপ কিনে ইউটিউব দেখে কম্পিউটার চালানো এবং কপি-পেস্টের প্রাথমিক কাজ শেখেন। ধীরে ধীরে দুলাভাইয়ের কাজে সাহায্য করার পাশাপাশি নিজে নিজে ওয়েব ডিজাইন শিখতে শুরু করেন।
২০২৩ সালে সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (এসইও) তাঁকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। ২০২৪ সালের জুন থেকে পুরোদমে আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ শুরু করেন। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০২৫ সালের মধ্যেই আপওয়ার্কে ‘টপ রেটেড’ এবং পরে ‘টপ রেটেড প্লাস’ ব্যাজ অর্জন করেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের দুটি নামকরা মার্কেটিং এজেন্সিতে এসইও স্ট্র্যাটেজিস্ট হিসেবে কাজের সুযোগ পান। বর্তমানে আপওয়ার্ক থেকে তাঁর আয় প্রায় ৫০ হাজার ডলার এবং আড়াই বছরের ফ্রিল্যান্সিংয়ে মোট আয় প্রায় ১ লাখ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা)।
সাফল্যের এই উজ্জ্বল মুহূর্তে এসে জীবনে নেমে আসে এক বড় শোক। ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর মারা যান তাঁর বাবা মো. সোহরাব হোসেন পাহলান। বাবা পুরোপুরি ছেলের সাফল্য দেখে যেতে পারেননি, তবে মুহাইমিনুল এখন বাবার স্বপ্নকেই বাঁচিয়ে রাখতে চান। শুরুতে পরিবারের অনেকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের বিরোধিতা করলেও পরে সকলেই তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন।
যে তরুণ একদিন ১৬ হাজার টাকা বেতনের চাকরিতে সীমাবদ্ধ ছিলেন, তাঁর আজ মাসিক আয় তিন লাখ টাকা। বর্তমানে তিনি একা নন—নিজের কিছু বন্ধু ও ছোট ভাইদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘ফ্লাস্ক এসইও’ নামের একটি দক্ষ দল। এই দল নিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আরও বড় কিছু করার পরিকল্পনা করছেন মোরেলগঞ্জের এই সফল ফ্রিল্যান্সার।


