ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে শুরু হয়েছে ব্যতিক্রমী এক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘বাংলাওয়াকি’। জাপানের মিয়াওয়াকি পদ্ধতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশীয় প্রায় ১২০ প্রজাতির বিপন্ন বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে এই উদ্যোগে। উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই সংরক্ষণবাগানটি মূলত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিপন্ন বৃক্ষ প্রজাতিকে একটি ছোট পরিসরে সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য একটি জীবন্ত সংগ্রহশালা হিসেবে কাজ করবে।
প্রফেসর জসীম উদ্দিন জানান, ঢাকা বিভাগের বন, বিশেষ করে মধুপুর, ভাওয়াল ও শেরপুরের শালবনের দেশীয় বৃক্ষ প্রজাতির অন্তত একটি করে গাছ এখানে রাখার ইচ্ছা রয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের বাইরে এসে এসব গাছকে সরাসরি দেখে চিনতে পারবে এবং শিক্ষা ও গবেষণার কাজে ব্যবহার করতে পারবে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত ২৫ জুলাই চট্টগ্রামের বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ইনস্টিটিউট পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সেই সফরের কথা স্মরণ করে অধ্যাপক জসীম উদ্দিন বলেন, ফজরের নামাজের পর ভোর পাঁচটায় একজন সহকর্মীকে নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হন তারা। প্রায় সাড়ে এগারোটার দিকে ষোলশহরের বিএফআরআই নার্সারিতে পৌঁছে সেখান থেকে প্রায় ৩০ প্রজাতির বিপন্ন দেশীয় বৃক্ষের চারা সংগ্রহ করা হয়। প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধান ড. হাসিনা মরিয়ম আন্তরিক সহযোগিতা করেন। বিএফআরআই কর্তৃপক্ষ কোনো রাজস্ব মূল্য না নিয়ে চারাগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে উপহার হিসেবে দেয়, যার জন্য তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এরপর দলটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ইনস্টিটিউটে যায়। সেখানে প্রধান লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের অন্যতম উচ্চকায় ও আইকনিক বৃক্ষ বৈলামকে সরাসরি দেখা এবং এর সঠিক পরিচিতি জানা। সেখানকার অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আক্তার হোসেনের সহযোগিতায় বৈলামসহ আরও কয়েকটি বিপন্ন প্রজাতির চারা সংগ্রহ করা হয়। ঢাকায় বৈলামের চারা সহজে না পাওয়ায় ২০টির বেশি বৈলামের চারা সংগ্রহ করা হয়। সেখানে আগে থেকে রোপণ করা বিশাল একটি বৈলাম গাছ দেখে দলটি অভিভূত হয়ে পড়ে। অধ্যাপক জসীম উদ্দিন বলেন, আমাদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের একটি বৃক্ষ এত উঁচু হতে পারে—নিজ চোখে না দেখলে তা বিশ্বাস করা কঠিন। সেই গাছের সঙ্গে কয়েকটি ছবিও তুলে রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রাম থেকে ফেরার পথে ভাটিয়ারীর পাহাড়ি এলাকায় কিছুক্ষণ বিরতি নেওয়া হয়। পাহাড়, লেক আর সবুজের সমারোহে জায়গাটি মনকে প্রশান্ত করে। সেখান থেকে কিছু বন্য শাকসবজি ও ফল কিনে নেওয়া হয়। বিকেল পাঁচটার দিকে চৌদ্দগ্রামে যাত্রাবিরতি করে দুপুরের খাবার শেষে রাত প্রায় নয়টার দিকে ঢাকায় ফিরে আসা হয়।
সংগ্রহ করা চারাগুলো এখন বাংলাওয়াকির অংশ হবে। তবে এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু কিছু গাছ রোপণ করা নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেন দেশের দেশীয় ও বিপন্ন বৃক্ষগুলোকে সরাসরি চিনতে পারে, তাদের বৈশিষ্ট্য জানতে পারে এবং গবেষণার কাজে ব্যবহার করতে পারে—সেটিই মূল উদ্দেশ্য। এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃক্ষশুমারি সম্পন্ন করা হয়েছে। সেখানে ২৭৭ প্রজাতির মোট ১৭ হাজার ১৬১টি বৃক্ষ পাওয়া গেছে, যার অধিকাংশই বিদেশি প্রজাতির। অধ্যাপক জসীম উদ্দিনের স্বপ্ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস একদিন দেশীয় বৃক্ষের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে, যেখানে শিক্ষার্থী, গবেষক ও সাধারণ মানুষ এসে বাংলাদেশের বৃক্ষঐতিহ্যকে চিনতে পারবে। বাংলাওয়াকি সেই স্বপ্নেরই সূচনা।
তিনি আরও বলেন, দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন একটি করে দেশীয় বিপন্ন বৃক্ষবাগান গড়ে উঠতে পারে। শিক্ষা, গবেষণা ও সংরক্ষণ—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার এই উদ্যোগ একদিন দেশের হারিয়ে যেতে বসা বৃক্ষ ঐতিহ্য রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদী।




