১৯৭৯ সালে একটি পরিবেশগত সিদ্ধান্ত জাপানের আমামি ওশিমা দ্বীপে এক অভূতপূর্ব বিপর্যয় ডেকে আনে। বিষধর হাবু সাপের প্রকোপ কমাতে প্রায় ৩০টি ছোট ভারতীয় বেজি (যা বাংলাদেশ থেকে ওকিনাওয়া হয়ে সেখানে পৌঁছেছিল) ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই বেজিরাই সাপ না মেরে দ্বীপের দুর্লভ প্রাণীগুলোর শিকারে নেমে পড়ে, একসময় তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজারে। এই ভুল শোধরাতে জাপানকে চার দশকেরও বেশি সময় এবং বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়, শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালে দ্বীপটি বেজিমুক্ত ঘোষণা করা সম্ভব হয়।
প্রায় ৭১২ বর্গকিলোমিটারের এই দ্বীপটি পরবর্তীতে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। দ্বীপটির বনাঞ্চলে এমন অনেক প্রাণীর বসবাস যা পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না, যেমন আমামি খরগোশ, যা 'জীবন্ত জীবাশ্ম' নামে পরিচিত। তবে সত্তরের দশকে স্থানীয়দের মূল উদ্বেগ ছিল হাবু সাপের কামড়। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৬ সালের মধ্যে শুধু আমামি ওশিমা ও টোকুনোশিমা দ্বীপেই এই সাপের কামড়ের ২ হাজার ৬৭৩টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। সহজ সমাধান হিসেবে কর্তৃপক্ষ বেজিকে বেছে নেয়, কারণ সাপের শত্রু হিসেবে বেজির সুনাম সর্বজনবিদিত।
জাপানে বেজি আনার এই ঘটনা নতুন ছিল না। ১৯১০ সালে বাংলাদেশ থেকে ছোট ভারতীয় বেজি (সে সময় যার বৈজ্ঞানিক নাম হারপেসটেস অরোপাঙ্কট্যাটাস, বর্তমানে উরভা অরোপাঙ্কট্যাটা) ওকিনাওয়া দ্বীপে আনা হয়েছিল। সেই ওকিনাওয়া থেকেই ১৯৭৯ সালে ৩০টি বেজি আমামি ওশিমায় স্থানান্তর করা হয়। গবেষণায় বাংলাদেশ থেকে ওকিনাওয়া এবং সেখান থেকে আমামি ওশিমায় এই যাত্রাপথের প্রমাণ মেলে।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় বেজি ও হাবুর জীবনযাত্রার মৌলিক পার্থক্যের কারণে। হাবু মূলত নিশাচর, অন্যদিকে বেজি দিনের বেলায় সক্রিয় থাকে। ফলে শিকারি ও শিকারের মধ্যে সাক্ষাতের সম্ভাবনা খুব কম ছিল। জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয় জানায়, বেজিগুলো হাবুর বদলে আমামি খরগোশ, বিরল ব্যাঙ, স্থানীয় ইঁদুরসহ নানা প্রজাতির ওপর শিকারি হিসেবে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। এসব প্রাণীর বিবর্তনের ইতিহাসে এ ধরনের শিকারির সঙ্গে পরিচয় না থাকায় তারা সহজ শিকারে পরিণত হয়। দ্বীপে বেজির কোনো প্রাকৃতিক শিকারী না থাকায় এবং খাদ্যের অভাব না থাকায় তাদের বংশবিস্তার দ্রুত ঘটে। ২০০০ সালের দিকে আমামি ওশিমায় বেজির সংখ্যা আনুমানিক ১০ হাজারে পৌঁছে যায়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৯৯০-এর দশকে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বেজি ধরার উদ্যোগ নেয়। ২০০০ সালে শুরু হয় বড় আকারের নির্মূল অভিযান। ফাঁদ, টোপ, ক্যামেরা নজরদারি—সবকিছু ব্যবহার করা হয়। পরে প্রশিক্ষিত কুকুরও কাজে নামানো হয়। ২০০৫ সালে গঠন করা হয় 'আমামি মঙ্গুজ বাস্টার্স' নামে একটি বিশেষজ্ঞ দল। তবে কাজ যত এগোয়, ততই কঠিন হতে থাকে। সহজে ফাঁদে ধরা পড়া বেজিগুলো কমে গেলে বাকিরা আরও সতর্ক হয়ে দুর্গম এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে জাপানকে দ্বীপজুড়ে ৩০ হাজারের বেশি ফাঁদ ও ৩০০টির বেশি ক্যামেরা স্থাপন করতে হয়। নির্মূল অভিযানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল শেষ কয়েকটি বেজি খুঁজে বের করা, কারণ একটি প্রজননক্ষম স্ত্রী বেজি বেঁচে থাকলেই আবার নতুন করে বংশবিস্তার শুরু হতে পারত।
২০১৮ সালের এপ্রিলে শেষ বেজিটি ফাঁদে ধরা পড়ে। এরপর আর কোনো বেজির সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে দ্বীপটি বেজিমুক্ত ঘোষণা করতে আরও ছয় বছর লেগে যায়, কারণ বিশাল এলাকা থেকে কোনো প্রাণী সম্পূর্ণ নির্মূল হয়েছে তা প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন। অবশেষে ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে আমামি ওশিমা বেজিমুক্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্মূলের সম্ভাবনা ছিল ৯৮.৯ থেকে ৯৯.৭ শতাংশ।
এই দীর্ঘ অভিযানে খরচ হয়েছে প্রায় ৩.৫৭ বিলিয়ন ইয়েন, যা মার্কিন ডলারে প্রায় ২৩.৮২ মিলিয়ন এবং বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৯০ কোটি টাকা। তবে এই খরচের বিপরীতে সামাজিক মূল্যও অনেক বেশি। এক গবেষণায় দেখা গেছে, জীববৈচিত্র্য রক্ষার এই প্রকল্পের জন্য জাপানের জনগণ গড়ে ২ হাজার ৫৩৯ ইয়েন দিতে রাজি, যা পুরো দেশের হিসেবে ২৫৩.৯ বিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ১.৬৯ বিলিয়ন ডলারের সমান। অর্থাৎ প্রকল্পের ব্যয়ের তুলনায় সামাজিক মূল্য প্রায় ৭১ গুণ বেশি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনার মূল শিক্ষা হলো—প্রকৃতির কোনো প্রাণীকে একটি বাস্তুতন্ত্র থেকে সরিয়ে অন্য বাস্তুতন্ত্রে ছেড়ে দিলে তার আচরণ ও খাদ্যাভ্যাস মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। মানুষের ইচ্ছেমতো কাজ করবে বলে ধরে নেওয়া ভুল। আমামি ওশিমার ঘটনায় দেখা গেছে, একটি ভুল সিদ্ধান্ত শুধরাতে কখনো কখনো ৪৫ বছরও যথেষ্ট নয়।




