চলনবিলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে উত্তরবঙ্গের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীবিকা। একসময় যে বিলকে 'ভূমধ্যসাগর' বিশেষ বলে অভিহিত করা হতো, আজ তা সংকুচিত হয়ে নিছকই এক জলাশয়ে পর্যবসিত। ছয় মাস জলে কষ্ট, আর বাকি ছয় মাস জলের কষ্ট—এই প্রবাদ বিলের বাসিন্দাদের জীবনসংগ্রামের চিরন্তন সত্য। তবে সেই কষ্টও এখন বদলে গেছে; কারণ, আগের মতো পানিই আর নেই, মাছও নেই।
বিশাল এই জলরাশির অতীত গৌরবের কথা তুলে ধরেছেন বহু সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের সাহিত্যিক পরিমল গোস্বামী তাঁর 'স্মৃতিচিত্রণ' গ্রন্থে পোতাজিয়া গ্রামের বর্ষার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, বর্ষাকালে গ্রামের এমন অবস্থা হতো যে, তাকে 'পল্লী ভেনিস' বললে অত্যুক্তি হয় না। সে সময় সাইকেল বা মোটর চালানো ছিল অসম্ভব, আর যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ছিল নৌকা। গ্রামের উঁচু টিলাগুলো পানির মধ্যে দ্বীপের মতো ভেসে থাকত। শুধু পরিমল গোস্বামীই নন, তাঁর বাল্যবন্ধু ফণীন্দ্রনাথ রায়ও পোতাজিয়া গ্রামের সেই রূপ বর্ণনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, বছরে ছয় মাস এই অঞ্চল 'গ্রাম্য ভেনিস' হয়ে থাকলেও বাকি ছয় মাস বিশাল জলরাশি সরে গেলে ছোট টিলাগুলো দেখতে লাগত পশ্চিমের পাহাড়ের মতো।
শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জলরঙের ছবিও ফুটিয়ে তুলেছে শত বছর আগের এই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি। ১৯২৬-২৭ সালে আঁকা তাঁর 'শাহজাদপুর সিরিজ' এবং উল্লাপাড়া রেলস্টেশনের ল্যান্ডস্কেপে দেখা যায়, স্টেশনের দক্ষিণে খোলা প্রান্তর আর তার কিছু দূরেই সারি সারি নৌকা বাঁধা ঘাট। সেই ছবির সঙ্গে বর্তমান উল্লাপাড়ার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। ইতিহাসবিদ নীরদচন্দ্র চৌধুরীও তাঁর লেখায় ১৯২২ সালের ভয়াবহ বন্যার কথা স্মরণ করেছেন। সিরাজগঞ্জ থেকে ঈশ্বরদী যাওয়ার পথে রাতের বেলায় তিনি দেখেছিলেন, চারদিকে শুধু জল আর জল; রেলের বাঁধ ছাড়া স্থলের কোনো চিহ্নই নেই। পানির স্রোত এতই প্রবল ছিল যে, নৌকার মাঝিরা লগি ঠেকিয়ে নিজেদের নৌকা রক্ষা করছিলেন।
ঐতিহাসিক নথিপত্রে চলনবিলের বিশালতার প্রমাণ মেলে। 'ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়া' থেকে জানা যায়, ১৮২৭ সালে জনবসতি এলাকা বাদ দিয়ে বিলের জলমগ্ন অংশের আয়তন ছিল প্রায় ৫৫০ বর্গমাইল বা ১ হাজার ৪২৪ বর্গকিলোমিটার। মাত্র ৮২ বছর পরে ১৯০৯ সালে জরিপে দেখা যায়, সেই আয়তন কমে দাঁড়িয়েছে ১৪২ বর্গমাইলে। অর্থাৎ, এই সময়ের মধ্যে ৪০৮ বর্গমাইল জলভাগ হারিয়ে গেছে। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চলনবিলের আয়তন মাত্র ১৬৮ বর্গকিলোমিটার। নাটোরের প্রমথনাথ বিশী তাঁর 'চলন বিল' উপন্যাসে লিখেছেন, চারশো বছর আগে এই বিল রাজশাহী, পাবনা ও বগুড়ার অধিকাংশ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল। ব্রহ্মপুত্র ও পদ্মার সঙ্গমস্থলের পশ্চিমোত্তর অংশে অবস্থিত এই বিলকে উত্তরবঙ্গের নদনদীর স্নায়ুজালের নাভিকেন্দ্র বললে অত্যুক্তি হয় না। 'বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস' গ্রন্থেও একই বর্ণনা পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে, একসময় এই বিল এতটাই বিশাল ছিল যে, নৌকাযোগে রাজশাহী থেকে ঢাকা ও ময়মনসিংহ যেতে হলে এই বিল পেরিয়ে গোয়ালন্দের কাছে পদ্মা নদীতে পড়তে হতো।
চলনবিলের জীববৈচিত্র্যও ছিল অতুলনীয়। দেশি মাছের বিশাল ভান্ডার ছিল এই বিল। একসময় বিখ্যাত মাছের আড়ত ছিল লাহিড়ী মোহনপুর। ১৯২৩ সালে প্রকাশিত 'পাবনা জিলার ইতিহাস' গ্রন্থ থেকে জানা যায়, শুধু মাছ বিক্রির চালানের জন্য সরকার মোহনপুর স্টেশন থেকে বছরে প্রায় ৪০ হাজার টাকা রাজস্ব পেত। এখান থেকে বিপুল পরিমাণ কাছিমও রপ্তানি হতো কলকাতায়। কিন্তু শত বছরের ব্যবধানে সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বিলের ভেতর দিয়ে মহাসড়ক নির্মাণের ফলে মাছের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে, হারিয়ে গেছে জীববৈচিত্র্যও। নানান প্রজাতির মাছ এখন বিলুপ্তির পথে।
লেখকের শৈশব স্মৃতিতে এখনো ভাসে বর্ষার সেই দিনগুলো। বাড়ির সামনের ধু ধু প্রান্তর বর্ষায় টইটুম্বুর হয়ে যেত, দিগন্তবিস্তৃত জলরাশির ওপারে দেখা যেত মেঘডুম্বুরের ঘাট। সেই ঘাটের নাম শুনেই মনে হতো, ওটা বুঝি মেঘেরই দেশ। মেঘডুম্বুর মূলত ধলাই নদীর একটি ঘাট। এই নদীই পূর্ব দিকে গিয়ে মিলত বড়ালের সঙ্গে। আবার মেঘডুম্বুরের উত্তর থেকে এসেছে গোহালা নামের আরেকটি নদী। এসব নদীই একসময় বিলের জলপ্রবাহ সচল রাখত। জনশ্রুতি আছে, সব সময় পানি সচল বা 'চলন' অবস্থায় থাকত বলেই এই বিলের নাম হয়েছে 'চলনবিল'। তবে এখন সেই নদীগুলোর বেশিরভাগই ভরাট হয়ে গেছে বা দখলদারদের কবলে।
ধলাই নদীর পাড়ে ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গোচারণ ভূমি, যা বাথান বা ছাহাম নামে পরিচিত। রুদ্র বৈশাখের ঝড়, চৈত্রের খরপ্রবাহ, মাঘের শীত—সব কিছু উপেক্ষা করে খোলা আকাশের নিচে বাথানিরা তাদের গবাদি পশু নিয়ে থাকত। পাঁচ মাস এই বাথানে থাকার পর তারা পাততাড়ি গুটিয়ে চলে যেত অন্যত্র। তবে এখন সেই বাথানের পরিধিও অনেক কমে গেছে। মানুষের মতো গরুকে বন্দি করা হয়েছে সানবাঁধানো ঘরে। তবুও বর্ষার শুরুতে স্লুইসগেট খুলে দিলে বা বাঁধ ভেঙে গেলে সেই পুরোনো উন্মাদনা ফিরে আসে। দলে দলে মানুষ খালে-বিলে মাছ ধরতে নামে, চারদিকে উৎসবের আমেজ। পোকার ঝিঁঝিঁ ডাক, জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, শিশু-কিশোরদের চিতসাঁতার—সব মিলিয়ে বর্ষার সেই দিনগুলো ছিল অপার আনন্দের।
একসময় বিলের মাঝে অনেক খাল থাকায় খরালি মৌসুমে এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যাওয়া কঠিন ছিল। তাই বর্ষার সময়ই বিলের দুই পাড়ের মানুষের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন তৈরি হতো। নাইওরের নৌকা, বাইচের নৌকা, সারি গানের আসর—সব মিলিয়ে ছিল ভিন্ন এক জগৎ। কিন্তু সেই জগৎ আজ আর নেই। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ফিকে হয়ে গেছে বর্ষার রংও। ক্রমেই ফুরিয়ে যাচ্ছে চলনবিলের আয়তন, স্তব্ধ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে বিশাল জলরাশির প্রাণের স্পন্দন।




