গত জুলাই মাসে তাইওয়ানের সরকারি বিভিন্ন সংস্থাকে লক্ষ্য করে একটি ব্যতিক্রমী সাইবার আক্রমণ পরিচালিত হয়। দেশটির ডিজিটালবিষয়ক মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, হামলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছিল এবং এটি একটি বিদেশি উৎস থেকে পরিচালিত হয়েছিল। তবে আক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সফলভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হয়েছে।

২০ জুলাই থেকে তদন্ত ও পর্যবেক্ষণের কাজ শুরু হয়। সাইবার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ ইউনিটগুলো ওই মাসেই সরকারি কার্যালয়গুলোকে লক্ষ্য করে চালানো এই অস্বাভাবিক হামলা শনাক্ত করে। পরবর্তীতে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সাইবার সিকিউরিটির পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি সতর্কবার্তা জারি করা হয়। তদন্তের ফলাফলে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, হামলার পেছনে বিদেশি কোনো উৎসের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল। হামলাকারীরা প্রচলিত ম্যানুয়াল পদ্ধতির পাশাপাশি ওপেন ক্লর-এর মতো এআই এজেন্টভিত্তিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে একটি সংকর বা হাইব্রিড কৌশল প্রয়োগ করেছিল। আক্রমণের উৎস, ব্যবহৃত পদ্ধতি এবং প্রভাবের বিস্তৃতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হয়েছে। ধাপে ধাপে আক্রান্ত সংস্থাগুলো সমস্যা সমাধান ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে।

নতুন ধরনের এআই-উদ্ভূত সাইবার হুমকি মোকাবিলায় সরকার ইতিমধ্যে প্রতিরক্ষামূলক নির্দেশিকা প্রস্তুত করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিস্টেম মনিটরিং ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হয়েছে, যাতে প্রাথমিক পর্যায়েই সম্ভাব্য হামলা প্রতিরোধ করা যায়। তবে সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে সরাসরি কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি। চীনের তাইওয়ান অ্যাফেয়ার্স কার্যালয়ও এই বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাইওয়ান দীর্ঘদিন ধরেই চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে। বেইজিং গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত এই দ্বীপকে নিজেদের সার্বভৌম ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ অব্যাহত রেখেছে। দ্বীপটির কাছাকাছি নিয়মিত সামরিক মহড়া, ভুল তথ্য প্রচার এবং সাইবার হামলা—সবকিছুই এই বহুমুখী যুদ্ধ কৌশলের অংশ বলে মনে করা হয়। গত জানুয়ারি মাসে ন্যাশনাল সিকিউরিটি ব্যুরো জানিয়েছিল, আগের বছরের তুলনায় গত বছর হাসপাতালে থেকে ব্যাংক পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে চীনভিত্তিক সাইবার হামলা ছয় শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সেখানে গড়ে প্রতিদিন ২৬ লাখ ৩০ হাজার সাইবার আক্রমণের রেকর্ড ধারণ করা হয়েছে। সংস্থাটি আরও জানায়, কিছু হ্যাকিং অভিযান সামরিক মহড়ার সঙ্গে সমন্বয় করে চালানো হয়েছিল।

এই ঘটনার ঠিক আগের দিন ইসরায়েলের সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ড্রিম তাদের একটি ব্লগ পোস্টে এআইচালিত সাইবার হামলার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, এশিয়ার একটি অজ্ঞাত সরকারের গোপন তথ্য ও পাসওয়ার্ড চুরি করতে একটি অভিযান পরিচালিত হয়। এআই এজেন্টদের একটি দল যৌথভাবে কাজ করে নাম প্রকাশ না করা কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বহু পাসওয়ার্ড হাতিয়ে নেয়। মাত্র চার দিনের মধ্যে তাইওয়ানের বিচার মন্ত্রণালয়ের কর্মীদের রেকর্ড চুরি হয় এবং পারমাণবিক নিরাপত্তা সংস্থার দুর্বলতাগুলো স্ক্যান করা হয়। হ্যাকার এজেন্টদের সম্পূর্ণ অপারেশনের তথ্য উদ্ধার করে ড্রিম পুরো ক্যাম্পেইন পুনর্নির্মাণ করতে সক্ষম হয়। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, আক্রান্ত বিভিন্ন সংস্থাগুলো তাইওয়ানের সরকারি প্রতিষ্ঠান।

বিশ্বজুড়ে এআইনির্ভর হ্যাকিং অভিযানের ঝুঁকি কয়েক বছর ধরেই বাড়ছে, তবে সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে অ্যানথ্রপিকের মিথোসের মতো অত্যাধুনিক এআই মডেল বাজারে আসার পর হ্যাকারদের কাজ অনেক সহজ হয়ে গেছে। এই মডেলগুলো অল্প সময়ের মধ্যেই লক্ষ্যবস্তুর অভ্যন্তরীণ তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করতে পারে এবং দুর্বলতার সুযোগ নিতে সক্ষম।

সেমগ্রেপের নিরাপত্তা গবেষক ক্রিস থমাস এই প্রসঙ্গে বলেন, এআইনির্ভর হ্যাকাররা কত দ্রুত তাদের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে, এই স্পাই ক্যাম্পেইনটি তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। তবে এখনো এর পেছনে একজন মানুষের ভূমিকা রয়েছে। কাকে আক্রমণ করতে হবে এবং কী উদ্দেশ্যে তা করতে হবে, সেই নির্দেশনা দেওয়ার জন্য একজন অভিজ্ঞ মানুষেরই প্রয়োজন হয়। এটি শতভাগ স্বয়ংক্রিয় নয়; মূল নিয়ন্ত্রণে একজন দক্ষ অপারেটরই থাকেন।

সূত্র: রয়টার্স