ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) জ্যেষ্ঠ জেনারেল মোহাম্মদ রেজা নাকদি একটি বিরল সাক্ষাৎকারে সতর্ক করেছেন যে, চলমান সংঘাতে ওয়াশিংটন যদি পারমাণবিক অস্ত্র প্রয়োগ করে, তাহলে তার পরবর্তী সকালেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক স্থাপনা দখল করে নেওয়া হবে। পিবিএস-কে দেওয়া এই বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট করেন, ইরানের ওপর হামলার একটি ‘কড়া মাশুল’ রয়েছে এবং এই বার্তা যুক্তরাষ্ট্রকে পৌঁছে দেওয়াই তেহরানের অন্যতম লক্ষ্য।
জেনারেল নাকদি, যিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত, আরও বলেন, ‘তারা পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করার ঠিক পরদিন সকালেই বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের যত সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, তার সব কটি দখল করে নেওয়া হবে। আজকের পরিস্থিতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো নয়। বর্তমান বিশ্বের মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন। পৃথিবীর কোনো মানুষই এমন জঘন্য অপরাধ মেনে নেবে না। কারণ, তারা জানে, পরবর্তী সময়ে এ একই ঘটনার শিকার তারাও হতে পারে।’
এই সামরিক কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ইরানের অভিজ্ঞতাও তত বাড়বে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগে কখনো এমন প্রকৃত যুদ্ধের মুখোমুখি হননি তারা; কিন্তু বিগত পাঁচ মাসে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কৌশল অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আয়ত্ত করেছেন। তিনি ইঙ্গিত দেন, ২০২৯ সালের ২০ জানুয়ারি—অর্থাৎ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত—এই সংঘাতকে টেনে নিয়ে যাওয়াই তেহরানের একটি কৌশলগত উদ্দেশ্য হতে পারে। এর মাধ্যমে শত্রুকে ক্লান্ত ও দুর্বল করে ফেলা সম্ভব হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো শক্তি ইরানের ওপর হামলার সাহস না করে এবং দেশটি পুরোপুরি নিরাপদে বসবাস করতে পারে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ অভিযানে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বড় অংশ নিহত হন। জবাবে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক স্থাপনা ও অন্যান্য সম্পদের ওপর পাল্টা হামলা শুরু করে। জেনারেল নাকদি বলেন, ‘আমাদের এমন এক প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেন শত্রু কখনো আমাদের ওপর হামলা চালানোর সাহস না পায়।’
আলোচনার স্থবিরতা নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের লক্ষ্যে গত জুনে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী চুক্তিটি—যেখানে ১৪টি দফা ছিল এবং ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর কথা—বর্তমানে সম্পূর্ণ অকার্যকর। ১৭ জুন ট্রাম্প ও ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও, ৮ জুলাই ওয়াশিংটন হঠাৎ তা ‘ভেঙে গেছে’ বলে ঘোষণা দেয়। এক সপ্তাহ পর তেহরানও সমঝোতা স্মারক স্থগিত করে। বর্তমানে ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার ব্যর্থতার অভিযোগ তুললেও, তেহরানের দাবি—মার্কিন পক্ষ ইরানি বন্দরগুলোর অবরোধ প্রত্যাহার ও অবরুদ্ধ ব্যাংক সম্পদ মুক্তির প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে।
পারমাণবিক অস্ত্র প্রসঙ্গে জেনারেল নাকদি দৃঢ়ভাবে জানান, ইরানের নিজস্ব পরমাণু বোমা তৈরির কোনো পরিকল্পনা বা প্রয়োজন নেই। তাঁর মতে, তেহরানের প্রকৃত শক্তির উৎস হলো বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়, যা জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত। ‘আমাদের আসল পারমাণবিক বোমা হলো, বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়; যা আমরা জুলুমের বিরুদ্ধে লড়াই করে জয় করেছি। তাই আমাদের পারমাণবিক বোমার কোনো প্রয়োজন নেই,’ বলেন তিনি।
ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে তিনি দাবি করেন, তেহরান প্রতিদিন যত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করে, তার চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যায় প্রতিদিন নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। ‘আমরা এটি বিভিন্ন উপায়ে করে থাকি। অত্যন্ত সুরক্ষিতভাবে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির একাধিক গোপন পদ্ধতি আমাদের জানা আছে,’ বলেন তিনি। তাঁর মতে, যদি কখনো এমন দিন আসে যখন ইরানের কাছে আর একটিও ক্ষেপণাস্ত্র অবশিষ্ট থাকবে না, ঠিক তখন তারা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরও বেশি বিপজ্জনক ও মারাত্মক হয়ে উঠবে। কারণ, তাঁদের বিজয় বিশ্বাসের জোরেই অর্জিত হবে; ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ওপর তারা নির্ভরশীল নন।
‘যুক্তরাষ্ট্র নিপাত যাক’ স্লোগানের ব্যাখ্যা দিয়ে ইরানি জেনারেল জানান, এর লক্ষ্য মার্কিন সাধারণ জনগণ নয়; বরং সেই প্রশাসন, যা ৭০টির বেশি দেশে সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছে ও আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন করেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁদের ‘কোনো শত্রুতা নেই’।




