হিজরি বর্ষপঞ্জির মাসনির্ণয় নিয়ে ইসলামি আইনবিদদের মধ্যে সুদীর্ঘ বিতর্ক আজও নিষ্পত্তি হয়নি। মূল বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে পবিত্র কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনা বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে দ্বিমত। প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, 'তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখেই রোজা ভাঙো'— এই নির্দেশকে অনেক ফকিহ চাক্ষুষ দর্শনের ওপর জোর দিয়ে ব্যাখ্যা করেন। অন্যদিকে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের যথার্থ হিসাবকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রধান্য দেওয়ার পক্ষে মত দেন কেউ কেউ।

১৯৭৮ সালে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে চাঁদ দেখার জন্য দুটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়: সূর্যাস্তের সময় দিগন্ত থেকে চাঁদের উচ্চতা কমপক্ষে পাঁচ ডিগ্রি এবং চাঁদ-সূর্যের কৌণিক ব্যবধান কমপক্ষে আট ডিগ্রি। এই মানদণ্ড উত্তর আমেরিকার ফিকহ কাউন্সিল ও ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর ফতোয়া অ্যান্ড রিসার্চসহ একাধিক সংস্থা ব্যবহার করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশ ২০২১ সাল থেকে আরও শিথিল মাপকাঠি গ্রহণ করে, যেখানে উচ্চতা তিন ডিগ্রি ও কৌণিক দূরত্ব ৬.৪ ডিগ্রি নির্ধারণ করা হয়েছে।

একপক্ষের মতে, হাদিসে বর্ণিত 'দেখা' শব্দটি আক্ষরিক অর্থেই প্রত্যক্ষ দর্শনকে বোঝায়। আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহ একাডেমি (আম্মান, ১৯৮৬) এই অবস্থান গ্রহণ করে বলে জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব কেবল সহায়ক, কিন্তু নির্ভরযোগ্য সাক্ষীর সাক্ষ্যকে অগ্রাহ্য করতে পারে না। বিপরীত পক্ষে মিসরের দারুল ইফতা আল-মিসরিয়্যাহ এবং ফকিহ মুস্তফা আজ-জারকা যুক্তি দেন যে, যদি গাণিতিক হিসাব নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে চাঁদ দেখা অসম্ভব, তাহলে চাক্ষুষ সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যানযোগ্য। ইমাম সুবকিও এমত সমর্থন করেছিলেন।

ইসলামের প্রথম যুগে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্রের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য ছিল না, তাই সে সময়ের ফকিহগণ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। বর্তমান বিজ্ঞান সম্পূর্ণ ভিন্ন ও নির্ভরযোগ্য ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো, তাই এই প্রেক্ষাপটে আলোচনা পরিচালনার প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ১৮৯ নম্বর আয়াতে নতুন চাঁদকে সময় নির্ধারণের চিহ্ন বলা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেছেন, তিনি বান্দার জন্য সহজ করতে চান, কঠিন করতে চান না। নবীজির স্বভাবও ছিল সহজতা পছন্দকারী। চাঁদ দেখা নিয়ে মতভেদের কারণে প্রতিবছর মুসলিম দেশগুলোতে রোজা ও ঈদ শুরুর তারিখে পার্থক্য সৃষ্টি হয়, যা উম্মাহর ঐক্যের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

তবে এই বিতর্ক সরলীকরণ করা সম্ভব নয়। দুটো অবস্থানই ইসলামি চিন্তাধারায় সম্মানিত ও গ্রহণযোগ্য। বিজ্ঞানের হিসাবকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহারে ব্যাপক ঐকমত্য থাকলেও, তা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা হবে কি না—এ নিয়ে ফকিহদের মধ্যে মতপার্থক্য বাস্তব। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, আলোচনায় জটিলতা স্বীকার করে নমনীয়তার পথ বেছে নেওয়াই উত্তম।