কৃষি খাতে নিজের ভাগ্য গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে পথ চলেছেন রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার খালেকুজ্জামান প্রামাণিক। চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিকেই জীবনের মূল ভিত্তি হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তিনি, যা আজ তাকে সফল উদ্যোক্তার খ্যাতি এনে দিয়েছে। তাঁর গ্রাম প্রামাণিকপাড়ায় পা রাখলেই চোখে পড়ে সারি সারি আমগাছ। সেখানে লালচে মিয়াজাকি, বেগুনি রঙের কিউজাই, হলুদ ও সবুজের বিভিন্ন জাতের আম দেখতে দূরদূরান্ত থেকে প্রতিদিন ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। কেউ কেউ স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তোলেন, আবার কেউ ভিডিও করেন। প্রায় বারো বছর আগে মাত্র দুই একর জমিতে শুরু করা এই বাগান বর্তমানে ১০ একর জমিতে বিস্তৃত। শুধু আম চাষেই সীমাবদ্ধ না থেকে খালেকুজ্জামান তাঁর জমিতে মাছের খামার, গাভি ও ছাগল পালন শুরু করেন। ফলে গড়ে উঠেছে একটি সমন্বিত কৃষি খামার, যা তাকে সফল কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

১৯৮৪ সালে জন্ম নেওয়া খালেকুজ্জামানের বাবা শামসুল হক ছিলেন একজন সচ্ছল কৃষক। ২০০৭ সালে ডিগ্রি পাসের পর পরিবারের সদস্যরা চাকরির পথে এগোতে পরামর্শ দিলেও তিনি নিজের স্বপ্ন পূরণে কৃষিকেই বেছে নেন। ২০১০ সালের জুনে মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগঞ্জ গ্রামের কৃষক বাবলু মিয়ার আমবাগান দেখতে গিয়ে তাঁর মনে নতুন সম্ভাবনার আলো জ্বলে ওঠে। বাবলু মিয়ার সাফল্যের কাহিনী তাঁকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। পরে তাঁর কাছ থেকে আধুনিক আম চাষের বিভিন্ন কৌশল রপ্ত করেন। একই বছরের সেপ্টেম্বরে বাবার দেওয়া দেড় লাখ টাকা নিয়ে দুই একর জমিতে দেশি ও বিদেশি জাতের আমের চারা রোপণ করেন। তিন বছর পর প্রথম ফলন আসে এবং সেই বছরই আম বিক্রি করে তিনি আয় করেন ২ লাখ ২০ হাজার টাকা। এই অর্জন তাঁকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। লাভের অর্থ ও পরিবারের সহযোগিতায় তিনি ধীরে ধীরে বাগানের আকার বাড়াতে থাকেন।

বর্তমানে তাঁর বাগানে মিয়াজাকি, আম্রপালি, গৌড়মতি, হাড়িভাঙ্গা, বারি আম-১৬, কাটিমন, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, কিউজাই ও কিংসহ মোট ১১ জাতের আম রয়েছে। তিনি আম চাষের পাশাপাশি ৭০ শতক জমিতে আট বছর ধরে মাছ চাষ করছেন। এছাড়া খামারে আছে পাঁচটি উন্নত জাতের গাভি ও ছাগল। সবকিছু মিলিয়ে খরচ বাদে তাঁর মাসিক গড় আয় দেড় লাখ টাকার মতো। এই আয়ের মাধ্যমেই তিনি নতুন বাড়ি নির্মাণ করেছেন, তিন একর জমি কিনেছেন এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন এনেছেন। তাঁর খামারে নিয়মিত কাজ করে ১২ জন শ্রমিক। খালেকুজ্জামান জানান, আমের বাজার নিয়ে তিনি আগে থেকেই পরিকল্পনা করেন। মে মাসে বাজারে আমের প্রাচুর্য থাকায় দাম কম থাকে, তাই তিনি এমন জাতের আম চাষ করেন যা জুলাই-আগস্টে পাকে। মৌসুমের শেষ দিকে সরবরাহ কম থাকায় ভালো দাম পাওয়া যায়, ফলে কৃষকদের লাভ বেশি হয়।

শুধু নিজের সাফল্যেই তিনি সন্তুষ্ট নন; আশপাশের গ্রামের অনেক মানুষকে আম চাষ, মাছের খামার ও গবাদিপশু পালনে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তাঁর পরামর্শে বদরগঞ্জের মোস্তফাপুর গ্রামের মতিন সরদার, মেহেদী হাসান, বাদশা মিয়া, ফারুক সরকার, প্রামাণিকপাড়া গ্রামের পরিতোষ চক্রবর্তী, এনামুল হক, সাইদুল ইসলাম, মফিজার রহমান ও সাইফুল ইসলামসহ অনেকে বেকারত্ব দূর করেছেন। মতিন সরদার বলেন, ‘খালেকুজ্জামানের উৎসাহে দুই একর জমিতে আমের বাগান করেছি। পাশাপাশি ৯টি গাভি ও পাঁচটি ছাগলের খামার গড়ে তুলেছি। এখন কৃষিই আমার পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস।’ প্রামাণিকপাড়া গ্রামের হোসেন আলী জানান, পাঁচ বছর আগে খালেকুজ্জামানের বাগান ও খামার দেখে তিনিও আমের বাগান ও ছাগলের খামার শুরু করেন। এখন তাঁর খামার লাভজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। পাঁচটি ছাগল দিয়ে শুরু করলেও বর্তমানে আছে ২৩টি ছাগল। দুই একর জমির বাগানে চার ধরনের বিদেশি আম রয়েছে। ছাগল ও আম বিক্রি করে বার্ষিক খরচ বাদে তাঁর আয় হচ্ছে ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। তারাগঞ্জ উপজেলার সয়ার গ্রামের রনি মিয়া বাগান দেখতে এসে বলেন, ‘আমাদেরও আমবাগান আছে। এখানে এসে মিয়াজাকি, গৌড়মতি ও ব্যানানা ম্যাঙ্গো দেখে ভালো লেগেছে। ভবিষ্যতে এগুলোর চারা সংগ্রহ করে বাগান করার পরিকল্পনা রয়েছে।’ বদরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সেলিনা আফরোজ বলেন, চাকরির পেছনে না ছুটে বাগান করে খালেকুজ্জামান যে সাফল্য এনেছেন, তা অবিশ্বাস্য। তাঁর পথ অনুসরণ করে বদরগঞ্জ উপজেলার অনেকে এখন বাগান ও খামারের মালিক। যুবকদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে অনুকরণীয় উদাহরণ।