দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণের ফলে সৃষ্ট বন্যায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রায় ৪৮৮ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিক হিসাবে জানা গেছে। গত রোববার প্রায় এক লাখ হেক্টর ফসলি জমি পানিতে ডুবে ছিল। বর্তমানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কিছুটা কমলেও এখনো প্রায় ৮২ হাজার হেক্টর জমি পানির নিচে রয়েছে। বন্যায় অর্ধশতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, আগামী সপ্তাহের মধ্যে ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশ করা হবে।

বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আউশ ধান। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, এখনো প্রায় ৫৩ হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান পানিতে তলিয়ে আছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৯ হাজার হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ২০ হাজার হেক্টরের বেশি সবজির জমি। আর্থিক ক্ষতির হিসাব এখনো চূড়ান্ত না হলেও কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, প্রায় ১০ শতাংশ আউশ ধান নষ্ট হয়েছে, যার ফলে প্রায় তিন লাখ টন চালের উৎপাদন হ্রাস পেতে পারে। আমনের বীজতলা পুনরায় তৈরি করা গেলেও সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তবে কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন এই অর্থনীতিবিদ।

মৎস্য খাতে ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে বেশি। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় এ খাতে ৪০৭ কোটি ৪১ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্রায় ৩৪ হাজার মাছের খামার ও পুকুর এবং ৩ হাজার ৮৮৯টি মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় যেমন চট্টগ্রাম ও পটুয়াখালীতে পুকুর ও চিংড়িঘের মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কুমিল্লা ও রাজশাহী অঞ্চলেও পুকুরে পানি ঢুকে মাছ বেরিয়ে গেছে। এছাড়া বন্যায় ৪৬টি মাছ ধরার নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত এবং পাঁচজন জেলের মৃত্যু হয়েছে। পুকুরের পাড় ভেঙে অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রাণিসম্পদ খাতেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় সারা দেশে ৪ হাজার ৮১৯টি গবাদিপশুর খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে প্রায় ১৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া ছয় হাজারের বেশি হাঁস-মুরগি ক্ষতিগ্রস্ত এবং আড়াই হাজারের বেশি মারা গেছে। এই খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি টাকা। পাশাপাশি প্রায় ১২ হাজার টন দানাদার পশুখাদ্য নষ্ট হয়েছে এবং খড় ও ঘাসের খেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮১ কোটি ৫ লাখ টাকা।

টানা ভারী বৃষ্টিতে দেশের মোট ৪৩টি জেলা বন্যাকবলিত হলেও বেশি ক্ষতি হয়েছে ১৬টি জেলায়। জেলাগুলো হলো চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, কুমিল্লা, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, ঝালকাঠি, হবিগঞ্জ, নওগাঁ, যশোর, মেহেরপুর, বাগেরহাট ও বরগুনা।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত খামারি ও মৎস্যচাষিদের দ্রুত নগদ সহায়তা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান। তিনি বলেন, বন্যার কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সরকারকে পশুখাদ্যের সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও ত্রাণসহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুর রহিম প্রথম আলোকে জানান, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সাতটি জেলায় বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।