বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর পরিমাণ গত চার বছরে প্রায় দশগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে এই খাতে মাত্র ৩৪ লাখ ডলার পাঠানো হয়েছিল, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ২৭ লাখ ডলারে। এই উল্লম্ফনের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার পাঠানোর সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত।

২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক এক প্রজ্ঞাপনে জানায়, পূর্বানুমতি ছাড়াই ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের পক্ষে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত ছাড় করতে পারবে। এর আগে এই সীমা ছিল ১০ হাজার ডলার। এই সীমার মধ্যে গ্রাহকেরা চাইলে ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত নগদও নিতে পারবেন। হাসপাতালের নামে অথবা আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমেও এই অর্থ স্থানান্তর করা যাবে। এর ফলে যাদের চিকিৎসা ব্যয় ১৫ হাজার ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ, তারা সরাসরি এই সুবিধা পাচ্ছেন।

একটি বেসরকারি কোম্পানির কর্মী তৌহিদুল ইসলাম জানান, থাইল্যান্ডে তার স্ত্রীর ক্যানসারের চিকিৎসা চলছে। বৈধ পথে ডলার পাঠানোর সুযোগ বাড়ায় এখন ব্যাংক কার্ড ব্যবহার করেই খরচ মেটানো সম্ভব হচ্ছে। আগে হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে হতো, যা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ।

তবে শুধু এই সীমা বাড়ানোর মাধ্যমেই পুরো সমস্যার সমাধান হচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে বলেন, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চিকিৎসার জন্য চলে যায়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিপুল সংখ্যক মানুষ বিদেশে চিকিৎসা নিচ্ছে, ফলে দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা流失 হচ্ছে।

শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দীন আহমেদের মতে, ডলার পাঠানোর সীমা বাড়ানো একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও এর চেয়ে বেশি অর্থের প্রয়োজন হলে গ্রাহকেরা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিতে চান না। তারা নিজেরাই বিকল্প ব্যবস্থা করেন। তিনি প্রস্তাব করেন, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র বিবেচনায় বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের অনুমোদনের ক্ষমতা ব্যাংকগুলোর হাতে দিলে বৈধ পথে অর্থ পাঠানো আরও বাড়ত। বিশেষ করে দুরারোগ্য রোগের ক্ষেত্রে এই সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারত ভিসা দেওয়া বন্ধ রাখায় অনেক রোগী থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে যেতে শুরু করেন। এসব দেশে চিকিৎসা ব্যয় ভারতের তুলনায় অনেক বেশি। একই সঙ্গে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় রোগীদের আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়। এই পরিস্থিতিতেই বাংলাদেশ ব্যাংক সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বৈধ পথে পাঠানো ৩ কোটি ২৭ লাখ ডলার প্রকৃত চিত্রের খুব ছোট অংশ। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশি রোগীরা প্রতিবছর বিদেশে চিকিৎসার জন্য ৪০০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি ডলার ব্যয় করেন। এর সিংহভাগই এখনো পর্যটন ভিসায় গিয়ে অথবা অনানুষ্ঠানিক পথে পাঠানো হয়।