আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাংবাদিক ও শিল্পীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগ নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন দেশের ১০১ জন বিশিষ্ট নাগরিক। কবি নির্মলেন্দু গুণের নেতৃত্বে এই নাগরিকেরা বলেছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের স্বাধীন বিকাশ এবং পেশাগত নিরাপত্তা রক্ষায় এ ধরনের ঘটনায় রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে।

রাষ্ট্রসংলাপ ফোরাম নামের একটি সংগঠন গত রোববার ২ সাংবাদিক ও ২৪ নাট্যব্যক্তিত্ব ও অভিনয়শিল্পীসহ মোট ২৮ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি অভিযোগ দাখিল করে। দুই দিন পর মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ১০১ নাগরিকের পক্ষ থেকে এই উদ্বেগজনক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে একটি অজ্ঞাত ও জনসমর্থনহীন সংগঠনের পক্ষ থেকে কয়েকজন সাংবাদিক, নাট্যব্যক্তিত্ব, অভিনয়শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেকোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের আইনের আশ্রয় নেওয়ার অধিকার থাকলেও এই অধিকার কারও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা, পেশাগত হয়রানি বা ভিন্নমতকে ভয় দেখানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয় বলে তারা মনে করেন।

রাষ্ট্রসংলাপ ফোরামের অভিযোগ অনুযায়ী, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তারা ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে প্ররোচনা, সহযোগিতা ও উসকানি দিয়েছেন। এর প্রেক্ষিতে ১০১ নাগরিকের বিবৃতিতে বলা হয়, অভিযোগের ভিত্তি, প্রমাণ ও আইনগত গ্রহণযোগ্যতা যাচাই না করে জনপরিসরে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে এতে সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যম অঙ্গনে ভীতির পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, শিল্প, সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতিচর্চার বিকাশের জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি মৌলিক পূর্বশর্ত। ভিন্নমত, সমালোচনা কিংবা রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে শিল্পী, সাংবাদিক বা নাগরিকদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযোগ ও হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ড গণতান্ত্রিক পরিবেশকে দুর্বল করে। এর ফলে সমাজে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়। আইনকে যেন ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক বা প্রতিহিংসামূলক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা না হয়, সে বিষয়ে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলেও বিবৃতিতে আহ্বান জানানো হয়।

বিবৃতিদাতাদের মধ্যে কবি নির্মলেন্দু গুণ ছাড়াও রয়েছেন একুশে পদকপ্রাপ্ত লেখক ড. নুরুন নবী, কবি ও সাংবাদিক সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, শিশুসাহিত্যিক রহীম শাহ, অধ্যাপক ও লেখক ড. শামীম আহমেদ, অধ্যাপক এস এম মাসুম বিল্লাহ, ড. মাহমুদ হাসান, কথাসাহিত্যিক ড. মুকিত চৌধুরী, শিক্ষক ও লেখক ড. প্রদীপ মাহবুব, লেখক ও গবেষক সুজাত মনসুর, ড. ফরিদ আহমেদ, শিশুসাহিত্যিক হুমায়ূন কবীর ঢালী, কবি ও প্রকাশক আরিফ নজরুল এবং কবি ও কলামিস্ট মীর রবি। এ ছাড়া লেখক, কবি, সাংবাদিক, প্রকাশক, শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংস্কৃতিক সংগঠক, অভিনেতা, প্রযোজক, গণমাধ্যমকর্মী, গবেষক ও বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিরাও বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন।

তারা দেশের সব গণতান্ত্রিক শক্তি, সাংস্কৃতিক সংগঠন, সাংবাদিক সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।