জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট তীব্র তাপপ্রবাহ ও অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবিলায় ওরস্যালাইনের ভূমিকা ও যৌক্তিক ব্যবহার নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ২৬ জুলাই ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে আয়োজিত এই বৈঠকে জনস্বাস্থ্যবিদ, চিকিৎসক, উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তারা অংশ নেন। সঞ্চালনায় ছিলেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

বৈঠকে এসএমসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তছলিম উদ্দিন খান বলেন, ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ওরস্যালাইন) বিশ্বের জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী উদ্ভাবন, যা লাখ লাখ মানুষের জীবন রক্ষা করেছে। বাংলাদেশে ডায়রিয়াজনিত মৃত্যুহার কমাতে এর ভূমিকা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। প্রায় চার দশকের বেশি সময় ধরে এসএমসি ওরস্যালাইন দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। বর্তমানে বছরে প্রায় ১.২ বিলিয়ন স্যাশে উৎপাদনের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের কাছে এটি পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। তবে সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, ওরস্যালাইন অবশ্যই আধা লিটার বিশুদ্ধ পানিতে সঠিকভাবে গুলতে হবে এবং তৈরি করার ১২ ঘণ্টার মধ্যে খেতে হবে। এটি কোনো সাধারণ পানীয় নয়, এটি একটি ওষুধ।

এসএমসি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েফ নাসির বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তীব্র তাপপ্রবাহ ও অতিবৃষ্টির কারণে পানি ও স্যানিটেশন–সংক্রান্ত সমস্যা মোকাবিলায় ওরস্যালাইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাপপ্রবাহে শরীরের তাপজনিত চাপ মোকাবিলা এবং পানিবাহিত রোগে ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠায় এটি কার্যকর। তিনি জানান, এখন ওরস্যালাইন দেশের প্রায় সর্বত্র সহজলভ্য। তবে সচেতনতা তৈরির কাজ শেষ হয়নি; বরং জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় সঠিক সময়ে ওরস্যালাইন ব্যবহারের বার্তা নতুন করে পৌঁছে দিতে হবে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. সুকুমার সরকারের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তীব্র তাপপ্রবাহ, অতিরিক্ত ঘাম, হিট স্ট্রেস ও হিট স্ট্রোকের মতো নতুন জনস্বাস্থ্য–চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। আগে ওআরএসের প্রচারে এসব বিষয় ছিল না, এখন সময় এসেছে জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে ওআরএস–সংক্রান্ত বার্তায় যুক্ত করার। ২০২২ সালের বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে অনুযায়ী, ওরাল রিহাইড্রেশন থেরাপির ব্যবহার ৭৬ শতাংশ, যা এখনো সর্বজনীন নয়। তিনি দুটি কাজ জরুরি বলে মনে করেন: প্রথমত, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও সেবাদানকারীদের জন্য একটি মানসম্মত গাইডলাইন তৈরি এবং দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষের জন্য নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সহজ ও একীভূত বার্তা তৈরি।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ওরস্যালাইন নিয়ে প্রচারের পাশাপাশি অসুস্থ অবস্থায় খাবার, বিশেষ করে বুকের দুধ বন্ধ না করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। জিংকের সঠিক মাত্রা ও ব্যবহার নিয়েও স্পষ্ট বার্তা প্রয়োজন। বমি বা পাতলা পায়খানা হলে ওরস্যালাইন খাওয়াতে হবে, তবে সঠিক নিয়ম সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্যাশে একবারে আধা লিটার পানিতে গুলে ১২ ঘণ্টার মধ্যে অল্প অল্প করে খাওয়াতে হবে। তিনি সব ক্ষেত্রে শুধু ওরস্যালাইনই যথেষ্ট নয় বলেও মন্তব্য করেন।

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. তাহমীনা বেগম জানান, মানুষ এখন জানে ডায়রিয়া হলে ওরস্যালাইন খাওয়াতে হবে, কিন্তু সঠিক নিয়ম জানা সবচেয়ে বড় সমস্যা। অনেক মা আধা লিটার পানিতে পুরো প্যাকেট না গুলে অল্প পানিতে কিছুটা ওরস্যালাইন মিশিয়ে খাওয়ান, যা সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট করে। তিনি ওরস্যালাইনের পাশাপাশি শিশুকে স্বাভাবিক খাবার ও বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দেন।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু তীব্র তাপপ্রবাহেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অনিরাপত্তাও যুক্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে, নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা কমছে। তিনি ওরস্যালাইনের পাশাপাশি ডাবের পানি, ভাতের ঝোলের মতো অন্যান্য তরল খাবারের বিষয়েও মানুষকে জানানোর ওপর গুরুত্ব দেন।

ওয়াটার এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহান বলেন, ২০২৫ সালের জেএমপির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে উৎসের প্রায় ৪৭ শতাংশ পানি ই–কোলাই দ্বারা দূষিত। নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, আর ওরস্যালাইন জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা। তিনি প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় স্কুল, বাজার ও অন্যান্য জনসমাগমস্থলে অস্থায়ী হাইড্রেশন পয়েন্ট স্থাপনের পরামর্শ দেন।

ইউনিসেফের হেলথ ম্যানেজার ডা. দেওয়ান মো. ইমদাদুল হক বলেন, ওরস্যালাইন বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় সাফল্য। তবে নিরাপদ পানির সুযোগ এখনো সবার কাছে পৌঁছায়নি এবং ওরস্যালাইনের ব্যবহারও শতভাগ নিশ্চিত হয়নি। তিনি সমন্বিত বহু খাতভিত্তিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার চিরঞ্জিত দাস বলেন, ওরস্যালাইন লাখো মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও বাঁচাবে। তবে এর যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে ওরস্যালাইনের ব্যবহার আরও বাড়তে পারে, তাই এখনই মানুষকে বোঝাতে হবে এটি প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে।

ব্র্যাকের হেড অব ক্লাইমেট ব্রিজ ফান্ড সায়কা সিরাজ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তীব্র তাপপ্রবাহ ও অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি বাড়ছে। খোলা আকাশের নিচে কাজ করা মানুষের মধ্যে ওরস্যালাইন ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে, যা ইতিবাচক। তবে তরুণদের মধ্যে ওরস্যালাইন ও ইলেকট্রোলাইট পানীয়কে সাধারণ পানীয় হিসেবে নেওয়ার প্রবণতা উদ্বেগের বিষয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. শাহনূর শারমিন বলেন, গত কয়েক বছরে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে হিট এক্সহসশন, হিট সিনকোপ ও হিটস্ট্রোকের রোগী বাড়ছে। তিনি বলেন, প্রয়োজন না থাকলে শুধু দুর্বল লাগে বলে ওরস্যালাইন খাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

গবেষক ও অভিভাবক প্রতিনিধি সুচিত্রা সরকার বলেন, অনেক মা এখনো জানেন না কোন বয়সে কতটুকু ওআরএস দিতে হবে। ডায়রিয়া হলে বুকের দুধ, দুধ বা ডিম খাওয়ানো যাবে না—এমন ভুল ধারণাও রয়েছে। তিনি প্রচণ্ড গরমে স্কুলগামী শিশুদের সুরক্ষায় সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন।

বৈঠকের শেষে অংশগ্রহণকারীরা তীব্র তাপপ্রবাহে ওরস্যালাইন ব্যবহারের জন্য জাতীয় নির্দেশিকা প্রণয়ন, জনসচেতনতামূলক বার্তা প্রচার, স্কুল-বাজারে অস্থায়ী হাইড্রেশন পয়েন্ট স্থাপন এবং জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্য, পানি ও স্যানিটেশন খাতের সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের সুপারিশ করেন।