জামালপুরের সাত উপজেলায় সরকারি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ে চরম অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে। প্রথম আলোর সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্থানীয় উন্নয়নে ২২ কোটি ৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকার বিপরীতে গৃহীত ৫৩৮টি প্রকল্পের মধ্যে ৪২টি প্রকল্পের বাস্তব অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি আরও ৩৮টি প্রকল্পে আংশিক কাজ সম্পাদন করেই পুরো বরাদ্দের অর্থ তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, বকশীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন ‘শিশু যত্ন বিদ্যালয়’ নামের একটি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানকে চার লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। কিন্তু উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় নিশ্চিত করেছে যে উক্ত নামে কোনো প্রতিষ্ঠানই বকশীগঞ্জে নেই। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে কাজটি সম্পন্ন দেখানো হয়। তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাসুদ রানা দাবি করেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব না হওয়ায় ওই অর্থে ক্রীড়াসামগ্রী কিনে তিনি অন্যান্য বিদ্যালয়ে বিতরণ করেছেন।

জামালপুরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে প্রতিবেদকটি দেখেছেন, মেলান্দহ উপজেলার চরবাণিপাকুরিয়া ইউপি কার্যালয়ে কম্পিউটার সরবরাহের নামে দেড় লাখ ও একই কার্যালয়ের রংমেরামতের দুই লাখ টাকার কোনো কাজ হয়নি। আদ্রা ইউনিয়নের একটি মাদ্রাসার রাস্তা উন্নয়নে বরাদ্দ পাওয়া গেলেও, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ জানান, সেখানে প্রবেশের পৃথক কোনো রাস্তাই ছিল না। মেলান্দহের তৎকালীন ইউএনও এস এম আলমগীর দাবি করেন, ছবি ও ভিডিও দেখে অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছিল এবংতিনি সরেজমিন পরিদর্শনে যাননি।

মাদারগঞ্জ উপজেলায় ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সাত লাখ টাকার কম্পিউটার ও আসবাব কেনা প্রকল্পের কোনো হদিস মেলেনি। উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা জানান, এ ধরনের কোনো বরাদ্দই তার কাছে আসেনি। তবে তৎকালীন ইউএনও নাদির শাহ ও সাবেক আইসিটি অফিসার একবালিজুড়ী স্কুলে চারটি কম্পিউটার দেওয়ার দাবি করলেও, সেই স্কুলের নাম প্রকল্প তালিকায় নেই।

ইসলামপুরে জিও ব্যাগ ফেলে রাস্তা ও বাঁধ মেরামতে বরাদ্দ পেলেও আগে থেকেই হওয়া কাজকে পুনরায় দেখানো হয়েছে। স্থানীয় ইউপি সদস্য ও পিআইসি সভাপতি অনেকেই বলেছেন, তাদের না জেনেই স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল। দেওয়ানগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন মেরামতের কাজও হয়নি বলে দাবি করেছেন সাবেক কমান্ডার।

শুধু অস্তিত্বহীন নয়, আংশিক কাজ সম্পন্ন করেও অর্থ উত্তোলনের প্রমাণ মিলেছে। জামালপুর সদরের তিতপল্লা ইউনিয়নের একটি ঈদগাহের নিরাপত্তা দেয়ালের কাজ অসমাপ্ত রয়ে গেছে, অথচ পুরো টাকাই ব্যয় দেখানো হয়েছে। কেন্দুয়া ইউনিয়নের একটি মসজিদের উন্নয়নে এক লক্ষ টাকা বরাদ্দ পেলেও মসজিদ কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদার কর্ম মাত্র ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকার দাবি করেছেন। ইসলামপুরে আট লাখ টাকায় উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে নির্মিত টিনের ছাউনির যারেজের কাজের পরিমাণ ও বরাদ্দের মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখা গেছে।

শিক্ষা ও সামাজিক কর্মসূচিতে জামালপুর সদরে ৫৫ লাখ টাকার অধিক বরাদ্দ থাকলেও, ৪৮টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৫টির প্রধান শিক্ষক জানান, তারা কোনো অনুদানই পাননি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পলাতক থাকা, প্রশাসনে শুন্যতা এবং তদারকির দুর্বলতার সুযোগে ইউএনও ও এলজিইডির প্রকৌশলীদের হাতে ব্যাপক কর্তৃত্ব চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

জামালপুরের জালের নির্বাহী প্রকৌশলী রোজদিদ আহম্মেদ জানিয়েছেন, বরাদ্দের বিষয়ে ইউএনও ও চেয়ারম্যানরা কাজ করেলেও অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর সেলিম এই অনিয়মের নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্তের দাবি করেছেন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।