বিশ্বকাপ ফাইনালে লাল কার্ড প্রসঙ্গ উঠলেই ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে ভেসে ওঠে জিনেদিন জিদানের বিদায়ী ম্যাচের করুণ চিত্র। ২০০৬ সালের শিরোপা নির্ধারণী লড়াইয়ে ইতালির ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাজ্জির বুকে মাথা দিয়ে ঢুস মেরে সরাসরি লাল কার্ড দেখেছিলেন ফ্রান্সের কিংবদন্তি অধিনায়ক। শিরোপা জয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে এভাবে মাঠ ছাড়ার সেই দৃশ্য এখনও বহু সমর্থকের হৃদয়ে বেদনার সুর তোলে। অনেকের ধারণা, জিদান শেষ পর্যন্ত টিকে থাকলে ম্যাচের চিত্র ভিন্ন হতে পারত। এবার একই রকম অনুশোচনার ভার বইতে হবে আর্জেন্টিনার তরুণ তারকা এনজো ফার্নান্দেজকে। স্পেনের বিপক্ষে হাইভোল্টেজ ফাইনালে ৯৩ মিনিটে দুই হলুদ কার্ডের সমষ্টিতে লাল কার্ড দেখে মাঠের বাইরে চলে যান তিনি। যদি এই বহিষ্কার এড়ানো যেত, তবে ফলাফল হয়তো আর্জেন্টিনার অনুকূলে মোড় নিত। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের জালে সমতাসূচক গোলটি যিনি করেছিলেন, ফাইনালেও সেই নাটকীয়তার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে দলকে টেনে তোলার সামর্থ্য তাঁর ছিল। কিন্তু লাল কার্ডের ফলে আর্জেন্টিনা ১০ জনের দলে পরিণত হলে খেলার নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি স্পেনের হাতে চলে যায় এবং এর পরেই ব্যবধান গড়ে দেয় তারা।

তবে বিশ্বমঞ্চে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের লাল কার্ড দেখা মোটেও নতুন কোনো ঘটনা নয়। ১৯৭০ সালের আসর থেকে ফুটবলে আনুষ্ঠানিকভাবে লাল ও হলুদ কার্ডের প্রচলন শুরু হয়। এর পর থেকে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ফাইনালগুলোতে মোট ছয়জন ফুটবলার এই সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন। আশ্চর্যজনকভাবে, এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি নাম আর্জেন্টিনার — তিনজন। ফাইনালের ইতিহাসে সর্বপ্রথম বহিষ্কৃত হওয়ার রেকর্ডটি আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার পেদ্রো মোনজোনের দখলে। ১৯৯০ সালের ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির স্ট্রাইকার ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমানের ওপর আক্রমণাত্মক ফাউল করে সরাসরি লাল কার্ড দেখেন তিনি। এই ঘটনার মাত্র ২২ মিনিটের ব্যবধানে দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের কারণে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন আরেক আর্জেন্টাইন গুস্তাভো দেজোত্তি। দুজন মূল খেলোয়াড়কে হারিয়ে আর্জেন্টিনা সেবার ১-০ গোলে পরাজিত হয় এবং টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভঙ্গ হয় তাদের।

পরবর্তী ফাইনালে লাল কার্ডের শিকার হন ফ্রান্সের মার্সেল দেশাইলি। স্বাগতিক দেশ হিসেবে ১৯৯৮ সালের ফাইনালে ৪৯ মিনিটে প্রথম ও ৬৮ মিনিটে ব্রাজিলের কাফুর প্রতি ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেন তিনি। ১০ জনের দলে পরিণত হয়েও সেই ম্যাচে ফ্রান্স শক্তিশালী ব্রাজিলকে পরাস্ত করে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়নের গৌরব অর্জন করেছিল। এরপর ২০০৬ সালে জিদানের সেই বহুল আলোচিত ঢুসের ঘটনা ঘটে, যা সহকারী রেফারির নজরে আসায় সরাসরি লাল কার্ড উত্তোলিত হয়। ২০১০ আসরের ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের জন হেইতিঙ্গা প্রথমে স্পেনের জাবি আলোনসোর বুকে সরাসরি লাথি মেরেও কোনো শাস্তি পাননি। তবে পরে ৫৭ মিনিটে ডেভিড ভিয়া ও অতিরিক্ত সময়ের ১০৯ মিনিটে জাভির প্রতি ফাউল করে দুই হলুদ কার্ডে বহিষ্কৃত হন। তার প্রস্থানের সুযোগে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার গোলে চ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন। টানা তিনটি ফাইনাল লাল কার্ডশূন্য থাকার পর এবার ১৬ বছরের ব্যবধান ঘুচিয়ে পুরোনো রীতি ফিরিয়ে আনলেন এনজো। ৮২ মিনিটে প্রথম সতর্কতা পাওয়া এই মিডফিল্ডার ৯৩ মিনিটে স্পেনের তরুণ ডিফেন্ডার পাও কুবারসিকে ফাউল করলে রেফারি দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখান এবং তা লালে রূপ নেয়। ফলে এক দশকেরও বেশি সময় পর আবারও ফাইনালে লাল কার্ডের সাক্ষী হলো ফুটবল বিশ্ব।