মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আবুল কালাম আযাদের করা আপিলটি বাতিলের দাবিতে আপিল বিভাগে আবেদন দাখিল করেছে প্রসিকিউশন। সোমবার এ আবেদনটি দাখিল করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, এই আবেদনের ওপর আগামী ৩১ আগস্ট বিস্তারিত শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
আযাদের আইনজীবীদের দেওয়া তথ্যমতে, মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ১৩ বছর আগের রায়ের বিরুদ্ধে বিলম্ব মার্জনাসহ গত ৬ জুলাই আপিল করেন তিনি। সেই আবেদনে ৪ হাজার ৯১৫ দিনের বিলম্ব মার্জনা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডের সাজা স্থগিতেরও আবেদন করা হয়।
বিচারপতি মো. রেজাউল হকের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আপিল বিভাগের আজকের কার্যতালিকায় ১২ নম্বর ক্রমিকে শুনানির জন্য আযাদের আবেদনটি রাখা হয়েছিল। দুই পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করেন। আদালতে আযাদের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিকী, আইনজীবী মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান ও মীর ওসমান বিন নাসিম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আবুল কালাম আযাদকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রায়ের আগে থেকেই তিনি পলাতক ছিলেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত বছরের অক্টোবরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের সাজা এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়। এর আগে তাঁর দেশে ফেরার খবরও প্রকাশ পায়।
মৃত্যুদণ্ডের রায়ের ১৩ বছর পর চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করেন আবুল কালাম আযাদ। সেদিনই ট্রাইব্যুনাল এক আদেশে তাঁকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের সত্যায়িত কপি সরবরাহের নির্দেশ দেয়। একইসঙ্গে আপিল বিভাগের আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত আযাদ বর্তমান অবস্থাতেই থাকবেন বলেও উল্লেখ করা হয়।
দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর গত বছরের ৫ আগস্টের পর দেশে এসে তৎকালীন সরকারের কাছে আবেদন করেন আযাদ বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, সে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর মৃত্যুদণ্ড এক বছরের জন্য স্থগিত করে সরকার। সেই স্থগিতাদেশের ভিত্তিতেই দোষী সাব্যস্তকরণ ও সাজার বিরুদ্ধে আপিল করেন আযাদ। তিনি আরও বলেন, সরকারের এক বছরের স্থগিতাদেশ বাড়ানোর জন্য আযাদ পক্ষ আবেদন করলে সেটির বিরোধিতা করা হয়। সরকারের আদেশবলে দায়ের করা আপিলটি ট্রাইব্যুনাল আইনে রক্ষণীয় নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ২১(৩) ধারা অনুযায়ী ৩০ দিনের পরে কোনো আপিল দায়ের করা যায় না বলে শুনানিতে জানান চিফ প্রসিকিউটর। অথচ এই আপিলটি সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদের নীতিতে দায়ের করা হয়েছে, যেখানে কোনো আইনের বিধান আছে, সেখানে সেই অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হয় না। তাই আপিলটি খারিজের জন্য আবেদন করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। আদালত আবেদনটি গ্রহণ করেছেন এবং স্থগিতাদেশ বাড়ানো বা আপিল রক্ষণীয় কি না — তা নিয়ে ৩১ আগস্ট শুনানির দিন ধার্য করেছেন।
এক বছরের মধ্যে আপিল করার শর্তে আযাদের আবেদন মঞ্জুর করা হয়েছিল বলে জানান তাঁর আইনজীবী মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান। তিনি বলেন, গত বছরের ২২ অক্টোবর সরকার আযাদের আবেদন মঞ্জুর করে। সেই অনুযায়ী এক বছরের মধ্যে আত্মসমর্পণ করে আপিল দায়ের করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই আদেশের মেয়াদ আগামী ২২ অক্টোবর শেষ হবে। তাই স্থগিতাদেশ বাড়ানোর জন্য আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়েছে। আদালত বলেছেন, ২২ অক্টোবরের আগেই আপিলটি শোনা যায় কি না, সে বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর আপত্তি জানান। সবকিছু ৩১ আগস্ট শুনবেন বলে জানিয়ে আদালত বলেছেন, প্রসিকিউশনের আবেদন খারিজ হলে সেদিনই আপিলের শুনানি হতে পারে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর প্রথম রায়েই জামায়াতে ইসলামীর সাবেক রুকন আবুল কালাম আযাদকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধকালে হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এই রায় দেওয়া হয়েছিল।




