রাজধানীর আপিল বিভাগ বগুড়ার মহাস্থানগড়ের সংরক্ষিত এলাকায় স্থাপনা নির্মাণ, মাটি খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ নিষিদ্ধ সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেছেন। রবিবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদেশের ফলে ওই এলাকায় যেকোনো ধরনের নির্মাণকাজের ওপর স্থিতাবস্থা বহাল থাকবে বলে নিশ্চিত করেছেন রিট আবেদনকারীপক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, স্থিতাবস্থার কারণে নির্মাণ কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হবে না।

ঘটনার সূত্রপাত ২০১০ সালে, যখন মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) মহাস্থানগড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ধ্বংস করে স্থাপনা নির্মাণ, মাজার সম্প্রসারণ এবং সেখানে খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধের দাবিতে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করে। শুনানি শেষে ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি হাইকোর্ট রায় দেয়। সেই রায়ে একটি কমিটির সুপারিশ অবিলম্বে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়, যার মধ্যে ছিল প্রত্নস্থলে অবৈধ দখল রোধ এবং পূর্ব পাশে ২০০ ফুট দূরে একটি নতুন মসজিদ নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণের নির্দেশনা।

পরে ২০২০ সালে মহাস্থানগড়ে দখল নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে এইচআরপিবি পূর্বের রিটের ধারাবাহিকতায় নতুন একটি আবেদন করে। সেই আবেদনের ভিত্তিতে ২০২০ সালের ৫ মার্চ হাইকোর্ট প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় স্থানীয়দের মাটি খনন ও স্থাপনা নির্মাণ বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনসহ একাধিক নির্দেশনা প্রদান করেন।

এই হাইকোর্টের রায় ও আদেশের বিরুদ্ধে গত মাসে বিলম্ব মার্জনাসহ লিভ টু আপিল করে সরকার। আবেদনে ৫ হাজার ২৭৯ দিনের বিলম্ব মার্জনা চাওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে হাইকোর্টের রায় স্থগিতেরও আবেদন করা হয়। গত ১৪ জুলাই লিভ টু আপিলটি আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে শুনানির জন্য উপস্থাপিত হলে সেটি নিয়মিত বেঞ্চে পাঠানো হয়। আজ সেই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়ে আদেশ দেওয়া হলো।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। অন্যদিকে রিট আবেদনকারীপক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ, তাঁকে সহায়তা করেন আইনজীবী সঞ্জয় মণ্ডল।

লিভ টু আপিলের আবেদনে সরকার যুক্তি দেখিয়েছে, হাইকোর্টের আদেশের কারণে দীর্ঘদিন ধরে মহাস্থানগড় এলাকায় কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন বা সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। ঐতিহাসিক স্থানটিকে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণও আটকে আছে। উল্লেখ্য, পবিত্র ও ঐতিহাসিক মহাস্থানগড় মসজিদের উন্নয়নে সরকার ইতোমধ্যে অর্থ বরাদ্দ করেছে, কিন্তু আদেশের কারণে কোনো কাজ শুরু করা যাচ্ছে না।

বগুড়ার মহাস্থানগড় বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, যা একসময় মৌর্য ও গুপ্ত সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ শহর পুণ্ড্রবর্ধনের রাজধানী ছিল। এই এলাকার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় এর সংরক্ষণ ও উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে আদালতের এই রায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।