২০০৯ সালে প্রথম ‘ম্যানোস্ফিয়ার’ শব্দটির প্রচলন ঘটে। তখন দ্য স্পিয়ারহেড, রিটার্ন অব কিংস-এর মতো ব্লগগুলো ‘পুরুষের অধিকার’ প্রতিষ্ঠার কথা বলে নারীবাদী আন্দোলনের সমালোচনা করত, কখনও কখনও নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে উস্কে দিত। পরবর্তী দেড় দশকে শব্দটি অনেক বড় পরিধি পায়। এখন এটি শুধু ব্লগারদের গোষ্ঠী নয়; বরং নিজেদের পরিচয় ও বিশ্বাস নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা কনটেন্ট নির্মাতা ও ইনফ্লুয়েন্সারদের একটি বড় অংশও এর আওতায় এসেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা সংস্থা রিসেট টেক এবং অলাভজনক সংস্থা ইকুইমুন্ডোর গবেষকরা বলছেন, ম্যানোস্ফিয়ারকে নিছক একটি মতাদর্শ বললে ভুল হবে। এটি এখন একটি স্বতন্ত্র অর্থনীতিতে রূপ নিয়েছে, যা জেন-জি তরুণদের উদ্বেগ এবং সমাজের প্রতি তাদের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে লাভবান হচ্ছে।
‘দ্য গ্রিফট ইকোনমি: হাউ ইয়াং মেন আর বিক সোল্ড ফেক বিলংিং অ্যান্ড ফেক ওয়েলথ অনলাইন’ শিরোনামের নতুন এক প্রতিবেদনে সংস্থা দুটি দেখিয়েছে, পুরুষত্ব ও পুরুষ অধিকারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘আন্দোলন’টি মূলত একটি বিশাল শিল্পের মুখোশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “যে মুহূর্তে তরুণরা বিভ্রান্ত—রাজনীতিবিদরা ভয় দেখাচ্ছেন, চাকরির বাজার অনিশ্চিত, পুরুষত্বের সংজ্ঞা নিয়ে চলছে যুদ্ধ—সেখানে কিছু প্ল্যাটফর্ম, ইনফ্লুয়েন্সার এবং বিজ্ঞাপনদাতারা তরুণদের নিরাপত্তাহীনতাকে পুঁজি করে কোটি কোটি ডলার আয় করছে।” তারা আরও বলেছে, এই সুযোগসন্ধানীদের নিয়ে গভীর উদ্বেগ থাকা উচিত।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তরুণ পুরুষদের অবস্থা এখন সঙ্কটজনক। ইতিহাসে মাত্র তৃতীয়বারের মতো শ্রমবাজারে নারীদের সংখ্যা পুরুষদের ছাড়িয়ে গেছে, যার একটি বড় কারণ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ কমিয়ে দিচ্ছে তরুণ পুরুষেরা। আয়ের বদলে অনেক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এখন বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকছেন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ—কোনোটিতেই যুক্ত হচ্ছেন না, যাদের সংক্ষেপে বলা হয় ‘নিট’ (NEET)। পাশাপাশি অনলাইনে অতিরিক্ত সময় কাটানো তাদের নিঃসঙ্গতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। জার্নাল অব পলিটিক্যাল ইকোনমিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণ পুরুষরা কাজে না যাওয়ার সময়ের প্রায় ৭০ শতাংশ ভিডিও গেম খেলে বা বিনোদনমূলক কম্পিউটার ব্যবহার করে কাটাচ্ছেন।
এই দুর্বল গোষ্ঠীটির জন্য প্রয়োজন ছিল আত্মীয়তার অনুভূতি এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। আর ঠিক সেই সুযোগটিই কাজে লাগিয়েছেন অনলাইনের কিছু পুরুষ, যারা কোচিংয়ের বিনিময়ে আত্মনির্ভরতা, আধিপত্য এবং আবেগ চেপে রাখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেন-জি তরুণেরা এখন ‘লুকসম্যাক্সিং’ ট্রেন্ডেও মেতে উঠছেন। তারা প্রথমে ‘সফটম্যাক্সিং’ দিয়ে শুরু করে পরে ‘হার্ডম্যাক্সিং’-এর মতো ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতিতে যাচ্ছে—যার মধ্যে রয়েছে শরীর গঠনের নামে হরমোন ইনজেকশন, পরিপূরক, পেপটাইড এবং অস্ত্রোপচার।
এই সমাধানগুলো প্রচার করা কনটেন্ট নির্মাতারাও দারুণভাবে অর্থ উপার্জন করছেন। উদাহরণস্বরূপ, স্ট্রিমার অ্যাডিন রস কিক প্ল্যাটফর্মে প্রতি ঘণ্টায় স্ট্রিমিং থেকে ৩০ থেকে ৫০ হাজার ডলার আয় করেন, যেখানে তার নিজেরও অংশীদারত্ব রয়েছে। রসের প্রতিনিধি ফরচুনের মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেননি। শীর্ষস্থানীয় অন্যান্য স্ট্রিমারদের বার্ষিক আয় ১ থেকে ১০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যার মধ্যে অনলাইন কোর্স, স্পনসরশিপ এবং বক্তৃতার ফিও অন্তর্ভুক্ত।
গবেষকরা অবশ্য সতর্ক করে বলেছেন, তরুণদের নিরাপত্তাহীনতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই অর্থনীতির জন্য কোনো একটি নির্দিষ্ট ইনফ্লুয়েন্সারকে দায়ী করা ঠিক হবে না। প্রতিবেদনের সহ-লেখক ও রিসেট টেকের গ্লোবাল প্রজেক্টস অ্যান্ড ইনোভেশনের পরিচালক ক্রিস্টিনা উইলফোরের মতে, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদমিক সিস্টেমই এই ‘পুরুষত্ব শিল্পের’ উত্থানের জন্য দায়ী। ফরচুনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “ভাইরাল ট্রেন্ডগুলো দেখে অনেক সময় হাসি পায়, মনে হয় এটা কোনো বোকামি। কিন্তু এই ধারণা বিপজ্জনক, কারণ এর পেছনে যে বিশাল অবকাঠামো রয়েছে তা আমরা দেখতে পাই না।”
উইলফোর ভোক্তা সুরক্ষা বৃদ্ধি এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহিতার আহ্বান জানিয়েছেন। অনলাইন জগৎ নিয়ন্ত্রণে অন্য দেশগুলো ইতিমধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট প্রয়োগ করে কনটেন্ট মডারেশন, নিরাপত্তা এবং স্বচ্ছতার কঠোর নিয়ম চালু করেছে। উইলফোর বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো আমাদের জন্য যে পৃথিবী তৈরি করেছে, আমাকে সেটাতেই বাঁচতে হবে—এই ধারণা আমি মেনে নিতে পারি না।”
আমেরিকান ইনস্টিটিউট ফর বয়েজ অ্যান্ড মেনের ‘বয়েজ অ্যান্ড মেন অনলাইন’ প্রোগ্রামের পরিচালক ডেভিড সাসাকি ফরচুনকে বলেন, অ্যালগরিদমিক সিস্টেমের সমাধান শুধু পুরুষদের নয়, সবার জন্য অনলাইন নিরাপত্তা উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে। তবে তিনি তরুণদের রক্ষার জন্য শুধু পশ্চাৎমুখী পদক্ষেপ নয়, বাস্তব জীবনের সমাধান খোঁজার ওপর জোর দিয়েছেন। যেমন, প্রাপ্তবয়স্কদের মাধ্যমে তরুণদের জন্য সম্প্রদায় গড়ে তোলা এবং রোল মডেল তৈরি করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। সাসাকি বলেন, “সমস্যা চিহ্নিত করা ভালো, কিন্তু ছেলেদের সমস্যা নিয়ে অনেক কিছু বলা হয়েছে। যা অনুপস্থিত, তা হলো ইতিবাচক বার্তা—আমরা কী করতে পারি সেই বিষয়ে।”




