রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় ‘শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার স্মরণ’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার স্মরণ পর্ষদ। সভায় বিশিষ্টজনরা বলেন, শিল্পের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে মুস্তাফা মনোয়ারের বিচরণ ছিল না। তিনি তাঁর সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে অগণিত মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছেন। তাঁর মূল দর্শন ছিল ‘জীবনের জন্য শিল্প’ এবং ‘লড়াইয়ের জন্য শিল্প’। বিশেষ করে টেলিভিশনের শিশুদের অনুষ্ঠানে তিনি এক নতুন মাত্রা সংযোজন করেছিলেন। বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, মুস্তাফা মনোয়ারের মতো সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের মৃত্যু হয় না; তাঁর কাজ সংরক্ষণ ও প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেওয়া আবশ্যক।
উল্লেখ্য, ‘বাংলাদেশের পাপেটম্যান’ হিসেবে পরিচিত এই গুণী শিল্পী গত ২৯ জুন সকালে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন নিউমোনিয়া ও প্রোস্টেট ক্যানসারে ভুগছিলেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।
স্মরণসভায় চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী স্মৃতিচারণ করে জানান, ১৯৬১ সালে তৎকালীন ঢাকা আর্ট কলেজে তিনি মুস্তাফা মনোয়ারের ছাত্র ছিলেন। তিনি বলেন, ‘স্যার আমাদের ব্যাকরণ ছেড়ে মন ও হাত খুলে কাজ করতে বলেছিলেন। জলরঙে অত্যন্ত কম সময়ে তাঁর অসাধারণ কাজ দেখে আমরা অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমরা দুই দিনে যে ছবি আঁকতাম, তিনি তা ১৫ মিনিটে এঁকে দেখাতেন। ফলে তাঁর প্রতি আমাদের আকর্ষণ তীব্র হয়। আমাদের মধ্যে জড়তা কাটাতে তিনি পরে সংগীত ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে মনোযোগী হন এবং আমাদেরও তাতে যুক্ত করেন। এভাবেই স্যারের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে আমাদের সম্পৃক্ততা গড়ে ওঠে।’ ১৯৬৪ সালে টেলিভিশনে যোগ দিলেও ষাটের দশকের প্রতিটি একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে প্রতিবাদী ছবি আঁকার আসরে তিনি উপস্থিত থাকতেন বলে উল্লেখ করেন রফিকুন নবী। তাঁর মতে, মুস্তাফা মনোয়ারের মাঝে গভীর দেশপ্রেম ছিল এবং সে কারণে তিনি রবীন্দ্রনাথকে বেশি ধারণ করতেন।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক জানান, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় নারায়ণগঞ্জের একটি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র অবস্থায় মুস্তাফা মনোয়ার গ্রেপ্তার হন। তিনি বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বিপুলসংখ্যক পোস্টার এঁকেছিলেন, যেগুলোতে পুরো শহর ছেয়ে গিয়েছিল। এজন্য তিনি দুই মাস কারাবরণ করেন। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর বাবা, কবি ও শিক্ষক গোলাম মোস্তফা, তাঁকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেন। সেখানে সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর হাতের কাজ দেখে আর্ট কলেজে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেন। কলকাতা আর্ট কলেজ থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পধারাকে নানামুখী সমৃদ্ধি দান করেন এবং সরকারের বিপরীতে শিল্পের শক্তি নিয়ে অবস্থান নেন। তিনি বিকশিত শিল্পে স্নাত এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন।’
অভিনেতা ও নির্দেশক তারিক আনাম খান মুস্তাফা মনোয়ারকে বিশাল মাপের মানুষ উল্লেখ করে বলেন, ‘টেলিভিশনের বাচ্চাদের অনুষ্ঠানে তিনি যে নতুনত্ব এনেছিলেন, তা আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। তাঁর কাজ সংরক্ষণ করে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি।’ বিটিভির সাবেক মহাপরিচালক ম হামিদ স্মরণ করেন, সত্তরের দশকে বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসে ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিয়োগ পেয়েও তিনি যোগদান করেননি, যেখানে মুস্তাফা মনোয়ারের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এখন তিনি মনে করেন, সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল। তাঁর ভাষায়, ‘মুস্তাফা মনোয়ার আমার জীবন বদলে দিয়েছিলেন।’
মুস্তাফা মনোয়ারের সহধর্মিণী মেরী মনোয়ার সভায় অংশ নিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘তাঁকে দেশের মানুষ এত ভালোবাসে, তা ভাবা যায় না। আগে কোথাও বাইরে গেলে হাঁটা যেত না, সবাই তাঁকে ঘিরে ধরে ছবি তুলত।’ তিনি উপস্থিত সবাইকে কৃতজ্ঞতা জানান।
টেলিভিশন ডিরেক্টরস গিল্ডের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন ‘একজন পারফেকশনিস্ট’ বলে মন্তব্য করেন সংগঠনের বর্তমান সভাপতি ও অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিম। সভায় মুস্তাফা মনোয়ারের প্রযোজিত ‘রক্তকরবী’ নাটকের অংশ প্রদর্শনের পর ওই নাটকের অভিনেতা আবদুল আজিজ বলেন, ‘তিনি ছিলেন একজন পারফেকশনিস্ট। তাঁর কাছ থেকে অনেক শিক্ষা পেয়েছি। মুস্তাফা মনোয়াররা কর্মের মাধ্যমেই অমর হয়ে থাকেন।’ ‘মন্টু ভাই’ নামে পরিচিত এই শিল্পী তাঁকে ‘সরদার’ বলে ডাকতেন—এ স্মৃতি মনে করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আজিজ।
অনুষ্ঠানে বক্তৃতার ফাঁকে মুস্তাফা মনোয়ারের জীবন ও কর্মভিত্তিক তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। এছাড়া গান, আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশিত হয়। শিল্পী লাইসা আহমেদ লিসা রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে এবং শিল্পীর ভাগনি নিমা রহমান আবৃত্তি করে শ্রদ্ধা জানান। আলোকচিত্রী শঙ্কর সাঁওজাল ভাগনে জুলফিকার রহমানের কাছে মুস্তাফা মনোয়ারের একটি বাঁধাই করা ছবি হস্তান্তর করেন। অভিনেতা আফজাল হোসেন সভা সঞ্চালনা করেন। নাসির উদ্দীন ইউসুফ, কেরামত মওলা, নাসিম আহমেদ, সাইদুল হক, শামীম আরা নিপা প্রমুখও বক্তব্য রাখেন। সবশেষে মুস্তাফা মনোয়ারের তৈরি দলের পাপেট শো প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে স্মরণসভা সমাপ্ত হয়।




