চার বছর আগে র্যাবের হাতে গ্রেপ্তারের ঘটনায় নীরবতা ভেঙে ফেসবুকে দীর্ঘ একটি বিবৃতি দিয়েছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র অভিনেত্রী পরীমনি। শুক্রবার গভীর রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে পোস্ট করা ওই স্ট্যাটাসে তিনি দাবি করেন, ২০২১ সালের ৪ আগস্ট ‘বিশেষ মহলের স্বার্থে’ এবং ‘সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে’ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ওই ঘটনার ফলে তাঁর ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত জীবন—সবকিছুই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
পরীমনি তার বিবৃতিতে র্যাবের সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল খাইরুল ইসলামের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। সম্প্রতি একটি অনলাইন টক শোতে খাইরুল ইসলাম এমন কিছু তথ্য প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, যার মাধ্যমে দেশবাসী জানতে পেরেছে, বনানীর বাসায় দীর্ঘ অভিযানের পর তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনের নির্দেশেই তাঁকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
অভিনেত্রী বলেন, ‘আমার জীবনের একটি অধ্যায় আমাকে একজন শিল্পী, একজন নারী এবং একজন মানুষ হিসেবে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। সেই ঘটনার কারণে আমার ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং পেশাগত জীবন—সবকিছুই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ তিনি আরও লেখেন, পরবর্তী সময়ে মিথ্যা ও বানোয়াট মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে টানা ২৮ দিন কারাগারে রাখা হয়েছিল। ‘সেই সময়ের অভিজ্ঞতা আমার জীবনকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত করেছে, তা আল্লাহ আর আমি ছাড়া পৃথিবীর আর কারও পক্ষে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়,’—লিখেছেন তিনি।
গ্রেপ্তারের পর থেকে আজ পর্যন্ত ওই ঘটনার একজন ভুক্তভোগী হিসেবেই জীবন কাটাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন পরীমনি। তাঁর ভাষ্য, ‘যেভাবে আমাকে অপদস্থ করা হয়েছে, আমার সম্মান, নৈতিকতা এবং চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে থাকবে।’
রাষ্ট্রের উদ্দেশে কয়েকটি প্রশ্নও তুলেছেন এ অভিনেত্রী। তিনি লিখেছেন, ‘আমার সেই দিনগুলো কি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব? যে জীবন, যে সম্মান, যে মানসিক শান্তি আমি হারিয়েছি, তা কি আর কখনো ফিরে পাব? মানুষের মনে আমাকে নিয়ে যে অসত্য, বিভ্রান্তিকর ও বিতর্কিত ধারণা তৈরি করা হয়েছে, রাষ্ট্র কি তার দায় নেবে?’ তবে অতীত নিয়ে প্রতিশোধ নয়, সত্য ও ন্যায়বিচারের পক্ষে থাকতে চান বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ‘আমি কাউকে ছোট করতে চাই না, কাউকে অপমানও করতে চাই না। আমি শুধু চাই, ভবিষ্যতে আর কোনো নির্দোষ মানুষ যেন এ ধরনের অন্যায়ের শিকার না হন,’—লিখেছেন পরীমনি।
বিবৃতির শেষ দিকে কঠিন সময়ে পাশে থাকা পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী, সাংবাদিক ও ভক্তদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। ‘আমি অতীতের ক্ষত বয়ে বেড়াতে চাই না। আমি সামনে এগিয়ে যেতে চাই। আমি মুক্ত আকাশে পরীর মতো করেই উড়তে চাই। আমার কাজ, আমার সন্তান, আমার পরিবার এবং আমার দর্শকদের ভালোবাসা নিয়েই আমি বাকি জীবন বাঁচতে চাই,’—লিখেছেন তিনি।
প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের ৪ আগস্ট বনানীর বাসায় অভিযান চালিয়ে পরীমনিকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। পরে র্যাব-১-এর কর্মকর্তা মো. মজিবর রহমান বাদী হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, পরীমনির বাসা থেকে বিদেশি মদ, চার গ্রাম আইস (ক্রিস্টাল মেথ) এবং একটি এলএসডি ব্লট উদ্ধার করা হয়েছে। বর্তমানে এ মামলাটি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১০-এ সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।
এছাড়া ২০২১ সালের ৮ জুন সাভারের ঢাকা বোট ক্লাবে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন পরীমনি। তদন্ত শেষে ২০২২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পুলিশ নাসিরসহ তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। পরে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৯ তিন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। মামলাটি বর্তমানে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে একই ঘটনার জেরে ২০২২ সালের ১৮ জুলাই পরীমনির বিরুদ্ধে মারধর ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে ঢাকার আদালতে নালিশি মামলা করেন ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ। মামলাটিও বিচারাধীন।




