চলতি অর্থবছরের জন্য কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণের নতুন লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বছর মোট ৬০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫৪ শতাংশ বেশি। উল্লেখ্য, বিগত অর্থবছরে কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্য ছিল ৩৯ হাজার কোটি টাকা। সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি প্রকাশ করেন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর, নির্বাহী পরিচালক, পরিচালকসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরা উপস্থিত ছিলেন। পরে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ বছরের ঋণ বিতরণের লক্ষ্য, খাত এবং নতুন সংযোজন সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়েছে।

নতুন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর জন্য ২০ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা এবং বেসরকারি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া কৃষি খাতে ঋণের পর্যাপ্ত জোগান নিশ্চিত করে খাদ্য উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয় বাড়ানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখার কথা বলা হয়েছে।

প্রকৃত কৃষকদের কাছে ঋণ পৌঁছে দিতে নতুন নীতিমালায় বেশ কিছু শর্ত শিথিল করা হয়েছে। কৃষক কার্ড সংগ্রহে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, মৎস্য সম্পদ কর্মকর্তা ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার প্রত্যায়ন ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। শস্য ও ফসল খাতে আয় সৃষ্টিকারী কার্যক্রমে নিয়োজিত কৃষকদের জন্য পল্লি ঋণ বিতরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কৃষক দলের সদস্যসংখ্যার নির্ধারিত সীমাও শিথিল করা হয়েছে। ঋণ বিতরণের আগে আবশ্যিকভাবে পাস বই থাকা বা ইস্যু করার বিষয়টি আর বাধ্যতামূলক নয়। কিছু ক্ষেত্রে ঋণ বিতরণের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মতি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও শিথিল করা হয়েছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ বিতরণে নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। এসব কৃষকের জন্য জমি বা স্থাবর সম্পত্তির পরিবর্তে বিকল্প জামানত ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। নতুন নীতিমালায় মৎস্য চাষ ও প্রাণিসম্পদ খাতে একক বা দলবদ্ধ কৃষক ও খামারিদের ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, হ্যাচারিতে মাছের পোনা উৎপাদন, হাঁস-মুরগির বাচ্চা উৎপাদন এবং উট পালনকে কৃষিঋণ কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে।

পুনঃঅর্থায়ন সংক্রান্ত নীতিমালায় ১০ হাজার কোটি টাকা ও ৩ হাজার কোটি টাকার দুটি তহবিলের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কৃষিঋণের ক্ষেত্রে গ্রাহককে বিমা সুবিধার আওতায় আনার বিষয়টিও নতুন নীতিমালায় যুক্ত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যাংক ও গ্রাহকের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সমন্বয়ের ভিত্তিতে বিমা সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সারা বছর কৃষি খাতে ঋণ বিতরণ অব্যাহত রাখতে কয়েকটি ফলের চাষে ঋণ পরিশোধের সময়সীমা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কলা, পেঁপে, আম, লেবু, পেয়ারা ও লিচু চাষে ঋণ বিতরণের সময় এবং ফসল সংগ্রহের পর ঋণ পরিশোধের সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধি এবং টেকসই অর্থনীতি নিশ্চিত করতে কৃষি ও পল্লি খাতে পর্যাপ্ত অর্থের জোগান অপরিহার্য। কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধিতে নতুন এই নীতিমালা কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।