যুক্তরাষ্ট্রের ডটকম যুগের উত্থান-পতনের মধ্যে বিনিয়োগ ব্যাংকিংয়ে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন তিনি। পরে প্রাইভেট ইকুইটি খাতে চলে যান, যেখানে বড় তহবিলের জন্য কাজ করেছেন। ২০০০ সালে লন্ডনে টেলিকম কোম্পানিগুলোর ঋণ-ইকুইটি রূপান্তরের কাজ করতেন। সেসময় কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ও শেয়ারহোল্ডারদের জানাতে হতো যে তাদের মালিকানা এখন মাত্র এক শতাংশ। পাশাপাশি কর্মীদের এক-তৃতীয়াংশ ছাঁটাই করার দায়িত্বও ছিল তার ওপর। এই চাপের মধ্যে তিন বছর কাটানোর পর তিনি বুঝতে পারেন, এই ধারা আর চলবে না। শরীরের ওজন বেড়ে গিয়েছিল, পরিবারের সঙ্গেও দীর্ঘদিন দেখা হয়নি। তাই তিনি অবসরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং স্পেনের দক্ষিণে সোটোগ্রান্দেতে চলে যান।

তবে সূর্যালোক আর অবসরের নিস্তব্ধতা তাকে বেশি দিন টানতে পারেনি। দ্রুতই তার বিরক্তি ধরে যায়। ডিজিটাল ফাইন্যান্সের সেই সময়ে তিনি কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে মিলে ইউরোপের প্রথম ই-মানি লাইসেন্সগুলোর একটি অর্জন করেন। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে সেই সেবা ২০টির বেশি দেশে সম্প্রসারিত হয়। কার্ড সেবা, ভার্চুয়াল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, পিয়ার-টু-পিয়ার লেনদেন ও রেমিট্যান্স সেবা চালু করা হয়। দক্ষিণ ইউরোপের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাগজের চেকের বদলে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে আস্থা রাখতে উৎসাহিত করা হয়। চার বছর পর সেই প্রতিষ্ঠানটি দ্য ব্যাংকরপ-এর কাছে বিক্রি করে দেন তিনি। এরপর উত্তর-পূর্ব যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ইনস্টিটিউশনাল ব্যাংকিংয়ের দায়িত্ব সামলেছেন।

পশ্চিম উপকূল থেকে একটি ফোনকল আসার পর তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি ছোট ব্যাংক কেনার পরিকল্পনা করছিল এক তরুণ দল। বিশ্বের চতুর্থ বা পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতির রাজ্যে অবস্থিত ব্যাংকটির কর্মী সংখ্যা ছিল শতকের নিচে, বাজার মূলধন নগণ্য এবং মানসম্পন্ন সম্পদ ১ বিলিয়ন ডলারেরও কম। প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের দিক থেকে এটি ছিল একেবারেই স্থবির। তার কাজ ছিল ইনস্টিটিউশনাল ব্যাংকিং, ডিপোজিট অ্যাগ্রিগেশন এবং ভিসা-মাস্টারকার্ডের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রধান সদস্যপদ সম্পর্ক তৈরি করা। বিশ্বব্যাপী পেমেন্ট সল্যুশন তৈরির দায়িত্বও ছিল তার কাঁধে। সেই সঙ্গে একই রকম অবস্থায় থাকা অন্যান্য ব্যাংক অধিগ্রহণের কাজও করতে হতো।

প্রতিযোগিতার বাস্তবতা ছিল কঠিন। ওয়েলস ফার্গো, সিটি বা বড় আঞ্চলিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সরাসরি লড়াই করার শক্তি ছিল না। তাই কৌশলগতভাবে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বড় ব্যাংকগুলো যেসব গ্রাহককে উপেক্ষা করে, তাদের সংযোগ স্থাপন করা হয়। বড় ব্যাংকগুলো যেসব পণ্য তৈরি করতে পারে না বা চায় না, সেগুলো নির্মাণের দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়। ইবি-৫ ইমিগ্র্যান্ট ইনভেস্টর প্রোগ্রামকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য পণ্য তৈরি করা হয়। ওয়াল স্ট্রিটে বিক্রির পর নগদ লাভের জন্য বিশেষ মর্টগেজ পণ্যও ব্যবহার করা হয়। ট্রেডিং ও ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট ফার্মগুলোর জন্য ইনস্টিটিউশনাল ব্যাংকিং পণ্য তৈরি করে তারল্য বাড়ানো হয়। এই আয় দিয়ে অধিগ্রহণের খেলায় নামার সুযোগ তৈরি হয়। ফলাফল ছিল ব্যাংক অব ক্যালিফোর্নিয়ার অসাধারণ রূপান্তর। কর্মী সংখ্যা ৬০ থেকে বেড়ে ২ হাজারে, সম্পদ ৬০০ মিলিয়ন ডলার থেকে ১৭ বিলিয়ন ডলারে এবং বাজার মূলধন ৬০ মিলিয়ন থেকে ১.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। টানা তিন বছর এটি আমেরিকার দ্রুত বর্ধনশীল ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

ব্যাংক অব ক্যালিফোর্নিয়া ছেড়ে দেওয়ার পর আবারও অবসরের চেষ্টা করেন তিনি। তবে এবারও তা স্থায়ী হয়নি। তিনি একটি প্রবণতা লক্ষ্য করেন — কর্পোরেট মার্কেটিং ব্যয় ধীরে ধীরে টেলিভিশন ও ম্যাগাজিন থেকে সরে গিয়ে ক্রিয়েটর, প্রতিষ্ঠাতা ও ফ্রিল্যান্সারদের দিকে যাচ্ছে। ল্যাপটপ আর অনলাইন অডিয়েন্স নিয়ে যারা বিশ্বব্যাপী ব্যবসা গড়ে তুলছেন, তাদের দিকে নজর বাড়ছে। অ্যাথলেটদের কাছ থেকে এই ক্রিয়েটরদের দিকে স্পনসরশিপের টাকা সরছে। অথচ এই মানুষগুলোর জন্য তৈরি আর্থিক পণ্য এখনও সেসব মানুষের জন্য ডিজাইন করা, যাদের একটি নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তা ও দুই সপ্তাহ পর পর বেতন পাওয়ার অভ্যাস। বেশিরভাগ ব্যাংক ডাক্তার, আইনজীবী বা বেতনভোগী সাংবাদিককে গ্রাহক হিসেবে চায়। একাধিক প্ল্যাটফর্ম, তিনটি মুদ্রা ও এক ডজন দেশ থেকে যারা আয় করে, তাদের দেখে সমস্যা হিসেবে দেখে। তাদের কমপ্লায়েন্স ও রিস্ক বিভাগ এই ধরনের উদ্যোক্তাদের জন্য প্রস্তুত নয়।

তিনি হিসাব করে দেখেন, ৪০০ বিলিয়ন ডলারের ক্রিয়েটর ইকোনমির মধ্যে ৪০ থেকে ৬০ বিলিয়ন ডলারের একটি অংশ এই সেবার বাইরে রয়েছে। এই বাজারই তার লক্ষ্য। তিনি পূর্বের সহকর্মীদের নিয়ে দুই বছর নীরবে কাজ করেন। সেই প্রচেষ্টার ফসল এখন MAKE নামের একটি ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম। ক্রিয়েটর, ইনফ্লুয়েন্সার, ফ্রিল্যান্সার, ডিজিটাল উদ্যোক্তা, রিমোট কর্মী এবং একাধিক মুদ্রায় লেনদেনকারী ছোট ব্যবসাগুলোর জন্য এটি তৈরি। কমপ্লায়েন্স, রিস্ক ও ব্যাংকিং অবকাঠামো নির্মাণে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে, কারণ এই অংশটাই আস্থা অর্জন করে দেয়। প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিশ্চিত করা হচ্ছে যে, স্পেন, সিঙ্গাপুর বা জাপান থেকে আসা তহবিল বৈধ কিনা। এএমএল, কেওয়াইসি, কেওয়াইবি এবং বৈশ্বিক লেনদেন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী আয়ের উৎস থাকা মানুষদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ৫ মিলিয়ন ডলার নিজস্ব অর্থায়নে বিনিয়োগ করা হয়েছে, যাতে বিনিয়োগকারীদের টাকা নেওয়ার আগে সঠিক পণ্যটি তৈরি করা যায়।

বড় ব্যাংকগুলোর প্রতি তার বার্তা — সুযোগটি নতুন করে ডিজিটাল পণ্য তৈরি করা নয়, বরং মানুষের আয়ের ধরণ বদলে যাচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠান এখনও পুরোনো কর্মীবাহিনীর জন্য পণ্য তৈরি করছে, তারা বিশ্ব অর্থনীতির দ্রুত বর্ধনশীল গ্রাহক ভিত্তি হারাবে। ব্যাংকগুলোর কাছে তার পরামর্শ — যে আস্থা অর্জন করতে কয়েক দশক লেগেছে, সেটিকে কাজে লাগিয়ে বর্তমান বিশ্বের জন্য তৈরি হোন, অতীতের জন্য নয়।