শৈশবের স্মৃতি হাতড়ে এক লেখক জানিয়েছেন, শাপলা নামের এক মেয়েকে পড়াতে গিয়ে তাঁর পরিবারের সবাই প্রায় হিমশিম খেয়ে যেত। শাপলা রোজ সন্ধ্যায় লেখকদের সঙ্গে পড়তে বসত, কিন্তু ‘অ আ’ শেখানোর পর দিনই কেবল ‘অ’ মনে রাখত—‘ই’-তে ওঠার সুযোগই পেত না। ক, খ; এক, দুই; এ, বি, সি, ডি—সব বিষয়েই একই সমস্যা। অথচ শাপলা ছিল অত্যন্ত চটপটে মেয়ে, পদ্মার ওপারের চরে তার বাড়ি, ফলে এসব অক্ষর শেখা তার কাছে বাঁ হাতের খেলা হওয়ার কথা ছিল।

প্রথমে শীতকালে শাপলা লেখকদের বাড়িতে আসে। তার পরনে ছিল চাদর, গলায় বাঁধা। রোদে পোড়া মুখ আর হাসলে সামনের বড় বড় সাদা দাঁত দুটি নজর কাড়ত। মাঠের কাজ থেকে মুক্তি দিতে শাপলার নানি তাকে কোথাও কাজের জন্য রেখে যেতে এসেছিলেন। সব বুঝে লেখকের মা শাপলাকে রেখে দেন লেখকের সদ্য হাঁটা শেখা ছোট ভাইয়ের দেখাশোনার জন্য। ভাই তখন ‘ল’ উচ্চারণ করতে পারত না, বলত ‘র’—তাতেই শাপলার নাম হয়ে যায় ‘শাপরা’।

লেখকের চেয়ে এক-দুই বছরের ছোট শাপলা সারা দিন পাখির মতো উড়ে বেড়াত, গাছে গাছে উঠত, পুকুরে ডুবসাঁতার দিয়ে এপার-ওপার করত। তার ভেতরে ছিল অন্য রকম প্রাণশক্তি। তবু লেখক তাকে সঙ্গী হিসেবে কাছে টানতে পারেননি, তাদের মধ্যে এক অদৃশ্য দূরত্ব থেকে গিয়েছিল।

বিপরীতে, লেখকের স্মৃতিতে ভাসে নীলার কথা। নীলা ছিল লেখকের ভীষণ আপন, তার সমবয়সী। একসময় মাকে সাহায্য করতে আসা এক খালার মেয়ে ছিল নীলা। নীলা ছিল বোকা বোকা স্বভাবের; একবার ‘মাইসেলফ’ প্যারাগ্রাফ লিখতে গিয়ে লেখকের খাতা দেখে সে ‘মাই নেম ইজ তথাপি’ লিখে জমা দেয়—যা নিয়ে কয়েক দিন হাসাহাসিও হয়। শৈশবের অনেকটা জুড়ে নীলা একাই রাজত্ব করেছে। একসাথে পড়া, খেলা, গল্প—সব ভালো লাগায় ছিল সে।

কিন্তু সেই রঙিন প্রজাপতির মতো সময় বেশি দিন স্থায়ী হয়নি; নীলারা চলে যায়। কয়েক বছর আগে হঠাৎ নীলার সঙ্গে দেখা হলে লেখক কথা বলতে পারেননি। নীলার পরনে ছিল টুকটুকে বেগুনি শাড়ি, মাথায় ঘোমটা—পুরোদস্তুর সংসারী। লেখক ভেবেছিলেন, নীলার কাছে শৈশবের সেই ধূসর কাহিনির কোনো অর্থ নেই, সংসারের হাজার কাজের মধ্যে সেসব স্মৃতি লুকোচুরি খেলার সুযোগ পায় না। গলার কাছে সব কথা আটকে গিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত কিছুই বলা হয়নি।

শাপলা আবার ছিল নীলার একদম বিপরীত। একবার ছাদের রেলিংয়ে বসে দুষ্টুমি করে ঢিল ছুড়লে তা সরাসরি লেখকের চোখে লাগে, হাসপাতালে গিয়ে ব্যান্ডেজ করে ফিরতে হয়। তবে এসব খেলা বেশি দিন চলেনি; শাপলার নানি মিথ্যা বলে তাকে নিয়ে চলে যান। পরে জানা যায়, শাপলার বিয়ে হয়ে গেছে।

শাপলা চলে যাওয়ার পর তার পড়াশোনার রহস্য ধরা পড়ে—সে ইচ্ছা করেই পড়া ভুলে যাওয়ার ভান করত, যেন তাকে বেশি দূর পড়া না শেখানো হয়। এ কথা জানার পর লেখকের নিজের প্রতি প্রচণ্ড অভিমান হয়। তিনি বুঝতে পারেন, শাপলা ছিল প্রজাপতির মতো, পাখির মতো পোষ মানানো যায় না। নীলার মতো করে শাপলার সঙ্গে কোনো অলস দুপুরে গল্পের ঝাঁপি খোলা হয়নি, তাই শাপলাও হয়তো তাকে আপন ভাবতে পারেনি, চুপিচুপি মনের কথাও বলতে পারেনি। অথচ চলে যাওয়ার কয়েক দিন আগে পুকুরঘাটে শাপলা সবার কাছে গল্প করেছিল, ‘আমার পড়তে ভালো লাগে না। তাই ইচ্ছা করেই পড়া ভুলে যাওয়ার ভান করি, যাতে ওরা আমাকে বেশি দূর পড়া শেখাতে না পারে।’