লন্ডনের ডকল্যান্ডস লাইট রেলওয়েতে (ডিএলআর) বর্তমানে একজন অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মারওয়া খায়ের। স্বয়ংক্রিয় ট্রেনের অপারেটর থেকে প্রশিক্ষকের পদে উন্নীত হওয়ার এই পথচলায় তাঁকে অতিক্রম করতে হয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। তাঁর ঘোষণার কণ্ঠস্বর এখনো ডিএলআরের অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়; ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিক ও প্যারালিম্পিকের সময় প্যারালিম্পিক মশাল বহনকারী ট্রেনের অপারেটর হিসেবে ক্যানারি ওয়ার্ফ থেকে স্ট্র্যাটফোর্ড পর্যন্ত যাত্রায় তাঁকেই বেছে নেওয়া হয়েছিল। সেই বিশেষ দিনে বিবিসিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম উপস্থিত ছিল এবং তাঁর ঘোষণা দেওয়ার ধরন প্রশংসিত হয়।
জন্ম সৌদি আরবে, বেড়ে ওঠা যুক্তরাজ্যে। বাংলা ভাষায় তাঁর দক্ষতা এতটাই ঝরঝরে যে শুনলে মনে হতে পারে সারা জীবন বাংলাতেই কাটিয়েছেন। গিটার বাজিয়ে প্রিয় বাংলা গানে সুর তোলেন তিনি। তবে তাঁর বর্তমান ব্যস্ততা প্রশিক্ষণের কাজেই বেশি কেন্দ্রীভূত।
২০০৮-০৯ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের আগে তিনি ন্যাটওয়েস্ট ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। এর পূর্বে ওষুধের দোকান ও মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানেও কাজ করেছেন। ব্যাংকিং খাতের চাকরির অনিশ্চয়তার কারণে নতুন পেশার সন্ধানে নামেন। তখন ডিএলআরে কর্মরত এক বন্ধু তাঁকে রেলওয়েতে আবেদন করতে পরামর্শ দেন। তুলনামূলক ভালো বেতন ও দীর্ঘমেয়াদি চাকরির নিশ্চয়তা তাঁকে এই পথে টেনে আনে।
আন্ডারগ্রাউন্ড, ওভারগ্রাউন্ড ও ডিএলআর—এই তিন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চলে লন্ডনের মেট্রোরেলব্যবস্থা। এর মধ্যে ডিএলআর পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোকে সংযুক্ত করেছে ৪৫টি স্টেশনের মাধ্যমে। প্রায় ৪০ বছর আগে চালু হওয়া এই স্বয়ংক্রিয় রেলব্যবস্থায় প্রতিটি ট্রেনে চালকের বদলে থাকেন একজন প্যাসেঞ্জার সার্ভিস এজেন্ট (পিএসএ)। ট্রেন থামার পর নিরাপদে দরজা বন্ধ করা, পরবর্তী যাত্রার জন্য প্রস্তুত করা, যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও গ্রাহক সেবা দেওয়া—সবই পিএসএর দায়িত্ব। ট্রেনে নিয়মিত ঘোষণা দেওয়া, গন্তব্য খুঁজে পেতে সহায়তা করা এবং ম্যাপ বুঝিয়ে দেওয়া তাঁর কাজের অংশ। ইস্ট লন্ডনের অনেক যাত্রী ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ নন বা লন্ডনের ম্যাপ বুঝতে সমস্যায় পড়েন; তাঁদের পথ দেখানোও পিএসএর কর্তব্য।
এই পদে যোগ দিতে কোনো কারিগরি পটভূমি বাধ্যতামূলক নয়। প্রায় চার মাসের প্রশিক্ষণ ও আরও দুই সপ্তাহের মূল্যায়নের পর লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মেলে ট্রেন পরিচালনার লাইসেন্স। ২০১১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ডিএলআরে যোগ দেন মারওয়া।
২০১২ সালের অলিম্পিকের আগে ডিএলআরের সিগন্যালিং ব্যবস্থা ছিল অনির্ভরযোগ্য। দিনে পাঁচ-ছয়বার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে হাতে নিয়ন্ত্রণে ট্রেন চালাতে হতো। অনুমতি ও নির্দেশনা নিয়ে নির্দিষ্ট স্টেশন থেকে স্টেশন পর্যন্ত ট্রেন চালানোর এই অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে রোমাঞ্চকর হলেও চ্যালেঞ্জিং ছিল। হাতে নিয়ন্ত্রণের সময় চালকের জন্য আলাদা কেবিন না থাকায় যাত্রীরা সরাসরি কাছে এসে কথা বলতেন। তাই আগে থেকেই ঘোষণা দিয়ে যাত্রীদের জানানো হতো যে ট্রেনটি এখন হাতে চালানো হচ্ছে এবং গতি কম থাকবে, গন্তব্যে পৌঁছাতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগবে। তবু অনেকেই প্রশ্ন করতেন কেন ধীরে চলছে। কিন্তু চালকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিরাপত্তা। কখনো কেউ ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করলে ট্রেন সরিয়ে নেওয়া বা পেছনের দিকে নেওয়ার মতো কঠিন দায়িত্বও পিএসএকে পালন করতে হতো। তাঁর কয়েকজন সহকর্মী এমন ঘটনার পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিলেন; পরবর্তীতে তাঁকেই ট্রেনটি সরানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
চার বছর ট্রেন পরিচালনার পর তিনি প্রশিক্ষক হিসেবে নতুন দায়িত্ব পান। এত দিন নিজে যে কাজ করেছেন, এখন অন্যকে সেই কাজে উপযোগী করে তুলতে হচ্ছে। পুরুষ-প্রধান কর্মপরিবেশে বয়স ও নারী পরিচয়ের কারণে তাঁকে আরও কর্তৃত্বপূর্ণ হতে হয়েছে। কখনো সরাসরি প্রতিরোধের মুখোমুখিও হয়েছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, নারীর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিতে হবে—এই কারণে কোর্স ছেড়েছিলেন দুজন প্রশিক্ষণার্থী। আরেকজন সরাসরি বলেছিলেন, “আমি আমার স্ত্রীকে ছেড়ে দিয়েছি, কারণ আমি চাই না কোনো নারী আমাকে কী করতে হবে, তা বলে দিক।” এসব অভিজ্ঞতা কষ্ট দিলেও তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে। তিনি শিখেছেন সীমারেখা টানতে এবং নিজের অবস্থানে অটল থাকতে। বর্তমানে তাঁর বিভাগে কর্মরত প্রায় তিন-চতুর্থাংশ অপারেটর কোনো না কোনো সময়ে তাঁর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন বলে তাঁর দাবি।
মারওয়ার দাদাবাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায়। সুযোগ পেলেই দেশে যান; সর্বশেষ গত অক্টোবরে গিয়েছিলেন। তবে দেশের মেট্রোরেলে এখনো ওঠা হয়নি—এ নিয়ে তাঁর আক্ষেপ রয়েছে। তাঁর বাবা প্রকৌশলী হিসেবে সৌদি আরবে পেশাজীবনের বড় সময় কাটিয়েছেন। খুব অল্প বয়সে লেখাপড়ার জন্য যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান মারওয়া। দক্ষিণ লন্ডনের বিভিন্ন স্কুল ও সিক্সথ ফর্ম কলেজে পড়াশোনা করেছেন। চাকরির পাশাপাশি নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন; এই শিক্ষার ব্যয় তাঁর প্রতিষ্ঠানই বহন করছে। চার বোনের পরিবারে বেড়ে ওঠা মারওয়া মনে করেন, তাঁর আজকের অবস্থানের পেছনে মা-বাবার বড় অবদান। মেয়েদের জন্য সুযোগ তৈরিতে তাঁরা কখনো ছেলে-মেয়ের পার্থক্য করেননি। পড়াশোনার পাশাপাশি গান, বাদ্যযন্ত্রসহ নানা বিষয়ে আগ্রহী হওয়ার সুযোগও দিয়েছেন। তিনি চান, নতুন প্রজন্মের ব্রিটিশ-বাংলাদেশি মেয়েরা প্রচলিত কয়েকটি পেশার বাইরেও নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখুক—ডাক্তার, শিক্ষক কিংবা সংসারের গণ্ডির বাইরেও রেলওয়ে, প্রকৌশল, প্রযুক্তিসহ অসংখ্য পেশা তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছে, সেটি তাঁরা জানুক।




