পনির কেবল একটি খাদ্যপণ্য নয়; অনেক দেশেই এটি ইতিহাস, ভূগোল ও জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্পেন, ইতালি, গ্রিস ও সুইজারল্যান্ডের চারটি স্বতন্ত্র পনিরের কাহিনি ফরাসি প্রবাসী এক লেখকের ধারাবাহিকের এই পর্বে তুলে ধরা হয়েছে। ফরাসিরা নিজেদের দেশের নানা স্বাদের পনিরের পাশাপাশি বিদেশি পনিরের প্রশংসাতেও পিছপা হন না, যা এই লেখায় স্পষ্ট।

স্পেনের মধ্যাঞ্চলের লা মাঞ্চা অঞ্চলের সমভূমি, পাহাড় ও নদীবেষ্টিত প্রকৃতিতে ভেড়ার পাল চরত প্রাচীনকাল থেকেই। ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুতে উৎপন্ন তৃণভূমির ফুল ও লতাপাতা খেয়ে ভেড়াগুলো যে দুধ দিত, তা সংরক্ষণের প্রয়োজন থেকেই জন্ম 'মানচেগো' পনিরের। মিগুয়েল দে সের্ভান্তেসের 'ডন কিহোতে' উপন্যাসেও লা মাঞ্চার খাদ্যতালিকায় এই পনিরের উল্লেখ রয়েছে। ১৯৮২ সালে স্পেনে এবং ১৯৯৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সুরক্ষিত তালিকায় স্থান পাওয়া মানচেগো এখন একটি স্বতন্ত্র ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য। নিয়ম অনুযায়ী, লা মাঞ্চা অঞ্চলের বাইরে উৎপাদিত পনিরে এই নাম ব্যবহার করা যায় না। শুধু ভেড়ার দুধ থেকে তৈরি এই পনিরকে কমপক্ষে ৩০ দিন থেকে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত পরিপক্ব হতে হয়। অল্প পরিপক্ব মানচেগো নরম ও মাখনের মতো মোলায়েম হয়, অন্যদিকে দীর্ঘদিন পরিপক্ব করা পুরোনো মানচেগো শক্ত, দানাদার ও তীব্র স্বাদযুক্ত হয়ে ওঠে। লা মাঞ্চার অনন্য জলবায়ু ও মাটির কারণে মানচেগো ভেড়ার দুধের বৈশিষ্ট্য অন্যত্র হুবহু অনুকরণ করা অসম্ভব বলেই মনে করা হয়। এই কারণে স্পেনে একে 'ভেড়ার দুধের স্বর্ণ' নামেও ডাকা হয়।

ইতালির মিলান শহর থেকে পূর্বে লোম্বার্দিয়া অঞ্চলের ছোট শহর গরগনজোলার নামেই বিখ্যাত নরম পনির 'গরগনজোলা'। নীল-সবুজ ছত্রাকের আস্তরনে ঢাকা এই পনির দেখতে অনেকের কাছেই পচা মনে হতে পারে, কিন্তু এই ছত্রাকই এর স্বাদ ও ঘ্রাণের মূল উৎস। জনশ্রুতি আছে, বহু বছর আগে এক তরুণ পনির কারিগর রাত জেগে দুধ জমাট বাঁধানোর সময় প্রেমিকার কথা মনে পড়ায় কাজ অসমাপ্ত রেখে চলে যান। কয়েকদিন পর ফিরে এসে তিনি পুরোনো জমাট দুধের সঙ্গে নতুন দুধ মিশিয়ে দেন। কয়েক সপ্তাহ পর সেখানেই নীল-সবুজ শিরার মতো ছত্রাকের জন্ম হয়, যার ফলে সৃষ্টি হয় কিংবদন্তি এই পনিরের। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় হাজার বছর আগে ইতালীয় খাদ্যসংস্কৃতির অংশ হিসেবে গরগনজোলার উৎপত্তি। বর্তমানে এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাস্তা, রিসোত্তো, পোলেন্তা কিংবা গরম রুটি, ফল ও বাদামের সঙ্গে খাওয়া হয়। মধু বা আঙুরের মিষ্টি স্বাদ এই পনিরের তীব্রতাকে নতুন মাত্রা দেয়।

গ্রিসের পাহাড়ি গ্রামগুলোতে প্রচলিত একটি উপকথা অনুযায়ী, দেবতাদের দূত হার্মিস মানুষকে প্রথম পনির তৈরির কৌশল শিখিয়েছিলেন। সাদা, নরম ও হালকা নোনতা-মিষ্টি স্বাদের 'ফেতা' পনির গ্রিসের সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অতিথির সামনে ফেতা পরিবেশন করা সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধি আহ্বানের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বীকৃত ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে ফেতা শুধু গ্রিসেই নির্দিষ্ট নিয়মে উৎপাদনের অনুমতি রয়েছে। গ্রিক প্রবীণদের মতে, ফেতার প্রকৃত স্বাদ কেবল দুধে নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পাহাড়ের ঢাল, রাখালের বাঁশির সুর আর ভূমধ্যসাগরীয় বাতাসে বেঁচে থাকা ঐতিহ্যের গল্পে নিহিত। ফ্রান্সেও এই পনিরের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে, দেশটির প্রায় প্রতিটি পনিরের দোকানে ফেতা পাওয়া যায়। দুধের লোনা ঘোলে ডুবিয়ে রাখা টুকরো টুকরো এই পনির গ্রিস ও ফ্রান্সে পর্যটকদের জন্য এক অপরিহার্য স্বাদ।

সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালার সবুজ উপত্যকায় অবস্থিত ছবির মতো সুন্দর লেতিভা গ্রামের নামে তৈরি 'লেতিভা' পনির বহু শতাব্দীর ইতিহাস ধারণ করে। প্রাচীনকালে পাহাড়ের মানুষ বিশেষ জাতের কাঠের আগুনে তামার কড়াইয়ে গরুর দুধ ফুটিয়ে এই পনির তৈরি করত। আজও সেই প্রাচীন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, যার ফলে হাজার বছর আগের ঘ্রাণ এখনো অক্ষুণ্ন থাকে। স্থানীয়দের ধারণা, আল্পসের ঢালে বুনো ফুল ও ঔষধি গাছ খেয়ে বেড়ে ওঠা গরুর দুধেই লেতিভার অনন্য স্বাদ ও সুগন্ধের রহস্য নিহিত। আধা শক্ত, দানাদার ও হালকা মিষ্টি এই পনিরে আনারসের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। লেখক জানান, ফ্রান্সে পনির নিয়ে কাজ করা তরুণ ম্যাথিসের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে, যিনি তাঁকে লেতিভার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন এবং এর স্বাদ নিয়ে তিনি মুগ্ধ হয়ে যান। বিশ্বায়নের এই যুগেও লেতিভা সুইজারল্যান্ডের লোকঐতিহ্য, পর্বতজীবন এবং শতাব্দীপ্রাচীন কারুশিল্পের অনন্য সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।