বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানিগুলোর একটি অ্যাপলের আগামী প্রধান নির্বাহী জন টার্নাসের সামাজিক মাধ্যমের উপস্থিতি প্রায় শূন্য। আগামী ১ সেপ্টেম্বর টিম কুকের কাছ থেকে দায়িত্ব নিতে যাওয়া এই হার্ডওয়্যার প্রধান তার লিংকডইন অ্যাকাউন্টে মাত্র দুটি চাকরির তথ্য রেখেছেন, কোনো পোস্ট বা কার্যকলাপ নেই। অথচ বর্তমান বিশ্বে ফরচুন ১০০-এর সিইওদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি অন্তত একটি সামাজিক মাধ্যমের প্রোফাইল রাখেন এবং মাসে অন্তত একবার পোস্ট করেন, জানিয়েছে যোগাযোগ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এইচ/অ্যাডভাইজারস অ্যাবারনেদির ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদন।

অ্যাপলের ঘোষণার পর সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, 'এমন এক যুগে যেখানে সবাই নিজের ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড নিয়ে মাতামাতি করে, অ্যাপল বেছে নিয়েছে সেই ব্যক্তিকে যার কোনো ব্র্যান্ডই নেই।' বিদায়ী সিইও টিম কুকের অবশ্য এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে ১.৫ কোটি ফলোয়ার রয়েছে এবং তিনি নিয়মিত পণ্য ঘোষণা দেন। তবে টার্নাসের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন।

অনেক বড় কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীরা এখন সামাজিক মাধ্যমকে পেশাদার জীবনের অংশ করে তুলেছেন। মেটার প্রধান মার্ক জাকারবার্গ নিজের ব্যক্তিগত জীবন ও পণ্যের আপডেট নিয়মিত শেয়ার করেন, আর এক্স-এর মালিক ইলন মাস্ক নিজের প্ল্যাটফর্মকে এতটাই ব্যবহার করেন যে টেসলার শেয়ারদর পর্যন্ত প্রভাবিত হয়। অন্যদিকে মাইক্রোসফটের সত্য নাদেলা ও জেনারেল মোটরসের ম্যারি বারার মতো নির্বাহীরা লিংকডইন ব্যবহার করেন সাবধানে, শুধুমাত্র পেশাদার আপডেটের জন্য।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বোর্ডগুলো এখন সিইও পদে এমন লোক চায় যারা সামাজিক মাধ্যমেও কোম্পানির মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করতে পারেন। বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের পরামর্শ, যারা ভবিষ্যতে সিইও হতে চান তাদের অন্তত পাঁচ বছর আগে থেকে সামাজিক মাধ্যমের উপস্থিতি তৈরি করা উচিত। ওয়েবার শ্যান্ডউইকের গবেষণায় দেখা গেছে, ৮১% নির্বাহী মনে করেন সিইওর দৃশ্যমান অনলাইন উপস্থিতি কোম্পানির সুনামের জন্য জরুরি।

তবে সবাই এই প্রবণতায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। জেপি মরগ্যানের জেমি ডিমন লিংকডইনে সক্রিয় থাকলেও সম্প্রতি দাভোসে এক সাক্ষাৎকারে সামাজিক মাধ্যমকে 'মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর' বলে মন্তব্য করেন। অন্যদিকে ব্ল্যাকরকের ল্যারি ফিঙ্ক নির্বাহীদের অবস্থানকে 'টেরারিয়ামে থাকার' সঙ্গে তুলনা করেছেন। বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের ওয়ারেন বাফেট ২০১৩ সাল থেকে এক্সে মাত্র সাতটি পোস্ট দিয়েছেন, আর তার উত্তরসূরি গ্রেগ অ্যাবেলের কোনো সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্টই নেই।

তবে কিছু নির্বাহী এই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছেন। ব্ল্যাকস্টনের প্রেসিডেন্ট জোনাথন গ্রে জগিং করার সময় ভিডিও বানিয়ে লিংকডইনে পোস্ট করেন, যা ক্লায়েন্টদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তার মতে, সরাসরি যোগাযোগ ব্যবসায় আস্থা বাড়ায়। অন্যদিকে ম্যাকডোনাল্ডসের সিইও ক্রিস কেম্পজিনস্কির একটি ভিডিওতে বার্গারের স্বাদ নেওয়া নিয়ে সমালোচনার শিকার হয়েছিলেন, যা দেখিয়ে দেয় এই মাধ্যমের ঝুঁকিও কম নয়।

ভবিষ্যতে এআই প্রযুক্তি আরও সহজ করে দিতে পারে নির্বাহীদের জন্য। এডেলম্যানের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্শিয়া নিউবার্ট মনে করেন, যেসব সিইও এখনই সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় না হবেন, তারা নিজেদের বর্ণনা অন্যদের হাতে তুলে দেবেন। তবে এআই-জেনারেটেড কন্টেন্টের ভিড়ে টিকে থাকতে প্রয়োজন হবে খাঁটি, মানবসৃষ্ট বার্তা। গ্রে বা জাকারবার্গের মতো যারা এই নতুন নিয়ম আগে বুঝে ফেলেছেন, তারা পেছনের প্রজন্মের জন্য কাজের সংজ্ঞাই পাল্টে দিচ্ছেন।