পদার্থবিজ্ঞানের এক পঞ্চাশ বছরের পুরোনো ধাঁধার সমাধানের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছেন বিজ্ঞানীরা। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ধারণা ছিল, প্রোটন ও নিউট্রনের স্থায়িত্ব এবং তাদের কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য তথা ব্যারিয়ন সংখ্যা ভেতরের তিনটি ভ্যালেন্স কোয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। তবে আন্তর্জাতিক কণা পদার্থবিজ্ঞানীদের সংগঠন স্টার কোলাবরেশনের সাম্প্রতিক গবেষণায় সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে শক্তিশালী প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যারিয়ন সংখ্যা আসলে কোয়ার্কের মাধ্যমে নয়, বরং কোয়ার্কগুলোকে একত্রে বেঁধে রাখা গ্লুঅন ক্ষেত্রের ইংরেজি ওয়াই-আকৃতির সংযোগস্থলের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এই ফলাফল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে পদার্থ ও প্রতিপদার্থের অসামঞ্জস্যের রহস্য সমাধানে নতুন পথ দেখাতে পারে।
ব্যারিয়ন কণা হলো পদার্থের সবচেয়ে স্থিতিশীল ও সুসংগঠিত রূপ, যার প্রধান উদাহরণ প্রোটন ও নিউট্রন। মহাবিশ্বের সবকিছু ধ্বংসের দিকে এগোলেও প্রোটনের ক্ষয় সাধারণত ঘটে না। এর পেছনে রয়েছে ব্যারিয়ন সংখ্যা সংরক্ষণের নীতি, যা সাধারণ পদার্থকে প্রতিপদার্থ থেকে আলাদা করেছে। ১৯৭০-এর দশক থেকে প্রচলিত মডেল অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যারিয়নে তিনটি কোয়ার্ক থাকে এবং প্রতিটি কোয়ার্ক এক-তৃতীয়াংশ ব্যারিয়ন সংখ্যা বহন করে। এই ধারণার বিপরীতে একটি বিকল্প তত্ত্বও বহুদিন ধরেই ছিল, যেখানে বলা হতো ভরহীন গ্লুঅন কণাগুলো একটি ওয়াই-আকৃতির জংশন তৈরি করে তিনটি কোয়ার্ককে ধরে রাখে, এবং এই ব্যারিয়ন জংশনই প্রকৃতপক্ষে ব্যারিয়ন সংখ্যা বহন করে। তবে এত দিন এই দুই তত্ত্বের মধ্যে সরাসরি পরীক্ষামূলক পার্থক্য নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।
নিউইয়র্কের ব্রুকহেভেন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে অবস্থিত রিলেটিভিস্টিক হেভি আয়ন কোলাইডারে প্রায় আলোর গতিতে পরমাণু কণার সংঘর্ষ ঘটিয়ে অবশেষে সমাধান খুঁজে পেয়েছেন রাইস ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানী নিকোল লুইসের নেতৃত্বাধীন গবেষক দল। সেখানে রুটেনিয়াম ও জিরকোনিয়াম পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সংঘর্ষে বিদ্যুতায়িত চার্জ এবং ব্যারিয়ন সংখ্যার গতিপথ পরিমাপ করা হয়। যেহেতু কোয়ার্কের বৈদ্যুতিক চার্জ আছে কিন্তু গ্লুঅন জংশনের কোনো চার্জ নেই, তাই গবেষকেরা লক্ষ্য করেন যে সংঘর্ষ অঞ্চল অতিক্রম করার সময় ব্যারিয়ন সংখ্যা চার্জের তুলনায় অনেক বেশি দূরত্ব অতিক্রম করে এবং দ্রুত পরিবাহিত হয়। এই পর্যবেক্ষণ থেকে স্পষ্ট হয়, ব্যারিয়ন সংখ্যা কোয়ার্কের চার্জের ওপর নির্ভরশীল নয়।
পরীক্ষাটি আরও এগিয়ে নিয়ে কোলাইডারে স্বর্ণের নিউক্লিয়াসের চারপাশে সৃষ্ট ভার্চ্যুয়াল ফোটনের সঙ্গে নিউক্লিয়াসের সরাসরি সংঘর্ষ ঘটানো হয়। যেহেতু ফোটনের কোনো ব্যারিয়ন সংখ্যা নেই, সংঘর্ষের পর নির্গত প্রতিটি ব্যারিয়ন সংখ্যা সোনার পরমাণুর মূল জংশন থেকেই উৎপন্ন হতে বাধ্য ছিল। উভয় পরীক্ষার ফলাফলই প্রচলিত কোয়ার্ক মডেলকে বাতিল করে দিয়ে পঞ্চাশ বছর আগের গ্লুঅন জংশন তত্ত্বকে সমর্থন করেছে। মিসিসিপি স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানী ওয়েনলিয়াং লি মনে করেন, এই আবিষ্কার কণাগুলোর মধ্যে শক্তিশালী মিথস্ক্রিয়া কীভাবে সাধারণ স্থায়ী পদার্থ গঠন করে, তা বুঝতে সহায়তা করবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মহাবিস্ফোরণের প্রারম্ভিক মুহূর্তে কেন প্রতিপদার্থের চেয়ে পদার্থের পরিমাণ বেশি সৃষ্টি হলো এবং কীভাবে আজকের দৃশ্যমান বিশ্ব টিকে রইল, তার মৌলিক ব্যাখ্যা খুঁজতে এই নতুন তথ্য বড় ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতে ব্রুকহেভেন ল্যাবরেটরির আরও শক্তিশালী ইলেকট্রন-আয়ন কোলাইডার চালু হলে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট।




