অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদেই সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সম্ভাবনা ও ঝুঁকি—উভয় দিক নিয়েই তাঁর অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তাঁর বিশ্বাস, আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে এআইয়ের সহায়তায় মানুষের অধিকাংশ রোগের চিকিৎসা কিংবা নিরাময় সম্ভব হতে পারে। বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। রোগের মূল কারণ অনুসন্ধান, জটিল বৈজ্ঞানিক সমস্যা সমাধান এবং নতুন ঔষধ তৈরির প্রক্রিয়ায় এআইয়ের ব্যবহার শুরু হয়েছে। তবে আমোদেই মনে করেন, প্রযুক্তিটির ক্ষমতা এখনও অনেকাংশে অব্যবহৃত রয়ে গেছে এবং এর প্রকৃত সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত।

সমালোচকদের অভিযোগ, আমোদেই তাঁর বক্তব্যে ঝুঁকির বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দেন। এই সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, তাঁর বিভিন্ন লেখা ও সাক্ষাৎকারে সম্ভাবনা ও বিপদ—উভয় দিকই সমানভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি তাঁর ‘মেশিনস অব লাভিং গ্রেস’ শীর্ষক নিবন্ধের প্রসঙ্গ টেনে ব্যাখ্যা করেন, প্রযুক্তি খাত পৃথিবীকে মানুষের জন্য আরও ভালো করে তোলার যে সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরছে, তা যথেষ্ট অনুপ্রেরণাদায়ক নয়। এই অভাব পূরণেই তিনি ওই প্রবন্ধ রচনা করেন। নিবন্ধের একটি বড় অংশে স্বাস্থ্য ও জীববিজ্ঞানে এআইয়ের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে প্রচলিত সংশয়ের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।

আমোদেই স্পষ্ট করেন, চিকিৎসাক্ষেত্রে এআইয়ের ভূমিকা কেবল রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ বা গবেষণার ফলাফল পর্যালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। জীববিজ্ঞানীরা যেসব কাজ সম্পাদন করেন, তার প্রায় প্রতিটি ধাপ—পরিচালনা, উন্নয়ন ও আরও নিখুঁতকরণ—সবকিছুতেই এআইকে ব্যবহার করা সম্ভব। গবেষণাগারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে শুরু করে ফলাফল বিশ্লেষণ এবং নতুন তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা—এই সমস্ত প্রক্রিয়াতেই প্রযুক্তিটি সহায়ক হতে পারে। এর ফলে নতুন আবিষ্কারের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। তাঁর অনুমান, শক্তিশালী এআই জীববৈজ্ঞানিক গবেষণার অগ্রগতির হার অন্তত দশ গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। এর মাধ্যমে আগামী পঞ্চাশ থেকে একশ বছরে যে পরিমাণ উন্নয়ন হওয়ার কথা, তা মাত্র পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যেই অর্জিত হতে পারে।

এই আশাবাদের পেছনে আমোদেইয়ের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও গভীরভাবে কাজ করেছে। হেপাটাইটিস সিতে আক্রান্ত হয়ে তাঁর বাবা মারা যান। তিনি জানান, তাঁর বাবার মৃত্যুর কয়েক বছর পর সরাসরি ভাইরাস প্রতিরোধী ঔষধ সোফোসবুভিরের উন্নয়ন ঘটে। এই ওষুধ হেপাটাইটিস সি আক্রান্ত প্রায় ৯৫ শতাংশ রোগীকে সুস্থ করতে সক্ষম। তাঁর ধারণা, ওষুধটি আরও আগে উপলব্ধ হলে সম্ভবত তাঁর বাবাকেও বাঁচানো যেত।

শুধু আমোদেই নন, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান জগতের আরও কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিও একই ধরনের আশাবাদ পোষণ করেন। গুগল ডিপমাইন্ডের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ডেমিস হাসাবিসও মনে করেন, এআই চিকিৎসাবিজ্ঞানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম। সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আগামী এক দশকের মধ্যে এআইয়ের সাহায্যে ‘রোগের অবসান’ ঘটানোর দিকে বড় ধরনের অগ্রগতি হতে পারে। তাঁর মতে, বর্তমানে একটি নতুন ওষুধ তৈরি করতে গড়ে প্রায় দশ বছর সময় এবং কয়েক বিলিয়ন ডলার খরচ হয়। গবেষণা থেকে বাজারে আসা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে। এআইয়ের সহযোগিতায় সেই সময় কয়েক মাস, এমনকি কয়েক সপ্তাহে নামিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। ওষুধ আবিষ্কারের এই ত্বরিত গতি মানবস্বাস্থ্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন বয়ে আনতে পারে। হাসাবিসের ধারণা, এআইয়ের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পেলে এমন সময় আসতে পারে, যখন মানুষের প্রায় সব রোগের চিকিৎসা বা নিরাময় সম্ভব হবে। সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে