মার্কিন কোম্পানিগুলো অবশেষে বিপুল পরিমাণ শুল্ক ফেরত পেতে শুরু করলেও তা নতুন এক অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের (আইইইপিএ) অধীনে আরোপিত শুল্ক বাতিল করার পর যে ১৬৬ বিলিয়ন ডলার ফেরতের পথ খুলে গিয়েছিল, তার প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি—অর্থাৎ ৭১ বিলিয়ন ডলার—ইতিমধ্যেই কোম্পানিগুলোর কাছে পৌঁছেছে। মার্কিন ট্রেজারির মাসিক বিবরণী অনুসারে, জুন মাসে একাই কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন ৪৯.২ বিলিয়ন ডলার ফেরত দিয়েছে। তবে এই অর্থ হাতে পেয়েও কোম্পানিগুলো নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপে পড়েছে, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও পণ্যের দাম বাড়ায়।
পেপসিকোর প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা স্টিভ স্মিট জানিয়েছেন, পণ্যের দাম বাড়ার চাপ মোকাবিলায় এই শুল্ক ফেরত ব্যবহার করা হবে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী রামন লাগুয়ার্টা মন্তব্য করেন, ইরান যুদ্ধ ও পেট্রোলের দাম বৃদ্ধি গ্রাহকের আচরণে প্রভাব ফেলেছে—বিবেচনামূলক ব্যয় ও সুবিধাজনক দোকানে যাওয়ার প্রবণতা কমেছে, যা বিক্রির সঙ্গে সম্পর্কিত। মশলা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ম্যাকরমিক অ্যান্ড কোম্পানির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা মার্কোস গ্যাব্রিয়েল গত মাসের এক উপস্থাপনায় বলেন, তাদের ৩১ মিলিয়ন ডলারের শুল্ক ফেরত উচ্চমূল্য পুষিয়ে নিতে সহায়তা করবে। তিনি উল্লেখ করেন, শুল্ক ও সীমিত মালবাহী সক্ষমতার কারণে গত এক বছরে প্রতিষ্ঠানটি দুইবার মূল্য বাড়িয়েছে। গ্যাব্রিয়েল আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আগে যা অনুমান করা হয়নি, তা আরও বেশি মূল্যস্ফীতি তৈরি করছে, তাই শুল্ক ফেরতের অধিকাংশই এই উচ্চ ব্যয় মেটাতে ব্যবহার হবে।
অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই বলছেন, ট্রাম্পের শুল্কনীতি মূল্যস্ফীতিমূলক ছিল। গোল্ডম্যান স্যাকস সতর্ক করে জানিয়েছে, আইইইপিএ শুল্ক বাতিল হলেও ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ১২২, ২৩২ ও ৩০১ ধারায় আরোপিত শুল্কের কারণে দাম বাড়তি থাকবে। কোম্পানিগুলো সরবরাহ চেইন ও মার্জিন সামঞ্জস্য করলেও অন্য দিকে চাপ বাড়ছে। গত মাসে পাইকারি মূল্যস্ফীতি কমলেও ট্রাম্পের ইরানের ওপর নতুন হামলা ও হরমুজ প্রণালীতে পুনরায় উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় বিশ্লেষকরা উদ্বিগ্ন। গোল্ডম্যান স্যাকসের প্রধান মার্কিন অর্থনীতিবিদ ডেভিড মেরিকল সতর্ক করে বলেন, সংঘাতের শুরুতে যেমন তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়েছিল, তেমন হলে আগামী মাসগুলোতে মূল মূল্যস্ফীতি ৩ থেকে ৪ বেসিস পয়েন্ট বাড়তে পারে। ব্যাংক অফ আমেরিকা সিকিউরিটিজের বিশ্লেষক স্টিভ জুনেউ ২০ মে এক নোটে ভবিষ্যদ্বাণী করেন, তেল ও গ্যাসের ব্যয় বেশি থাকবে, আর শুল্ক ফেরত উচ্চ মালবাহী ব্যয় মেটাতে সাহায্য করবে। তার মতে, আমদানিকারকরা হয়তো ভোক্তাদের কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে, তবে তা সরাসরি নয় বরং দাম ধীরে বাড়ানোর মাধ্যমে। ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ফেরত একটি মৃদু মুদ্রাস্ফীতি-বিরোধী শক্তি হতে পারে।
লন্ডন বিজনেস স্কুল ও ডিউক করপোরেট এক্সিকিউটিভ এডুকেশনের প্রভাষক রেবেকা হোমকেস বলেন, এই উদ্বেগ বড় কোম্পানিগুলোর জন্য বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। তার ভাষায়, এই বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ধাক্কা আসছেই—কিছুটা মুদ্রাস্ফীতি থেকে স্বস্তি পায়, তারপর শুল্ক ধাক্কা, সুপ্রিম কোর্টের রায়, আবার ইরান যুদ্ধের ধাক্কা। কোম্পানিগুলো বিভিন্নভাবে মানিয়ে নিচ্ছে। বিজের হোলসেল ক্লাবের প্রধান নির্বাহী বব এডি মে মাসে বিনিয়োগকারীদের জানান, শুল্ক ফেরত দোকানের পণ্যের দাম অর্ধেক শতাংশ কমাতে সাহায্য করবে। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠান গড়তে গ্রাহকদের কাছে মূল্য ফিরিয়ে দিতে যেকোনো লাভের উৎস ব্যবহার করা হবে। হোমকেসের মতে, অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে বোর্ড বা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ কমাতে বিকল্প বাড়াতে হচ্ছে, যেমন ব্যয় স্থগিত করা বা সরবরাহ চেইনের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো।
তবে আরও অনিশ্চয়তা সামনে রয়েছে। হোমকেস জানান, ইরান যুদ্ধের বাইরে শুল্ক এখনো নির্বাহীদের জন্য শীর্ষ তিনটি উদ্বেগের একটি। তবে আশার কথা হলো, বর্তমান শুল্ক পরিধিতে ছোট—১২২ ধারার শুল্ক এ মাসেই শেষ হবে এবং ৩০১ ধারার শুল্ক কেবল নির্দিষ্ট দেশের পণ্যের ওপর—তাই আইইইপিএ শুল্কের মতো ব্যাপক ও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা কম। হোমকেসের ভাষায়, সেই দিনগুলো এখন পর্যন্ত ফিরে আসবে বলে মনে হচ্ছে না।



