প্রখ্যাত নাট্যকার, অভিনেতা ও নির্দেশক মামুনুর রশীদ সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের নানা দিক তুলে ধরেছেন। ক্রাউন সিমেন্টের ‘অভিজ্ঞতার আলো’ অনুষ্ঠানে কথাসাহিত্যিক আনিসুল হকের সাথে এই দীর্ঘ আলোচনায় তিনি শৈশব থেকে শুরু করে নাটকের প্রতি তাঁর অনুরাগের গল্প বলেন।
মামুনুর রশীদের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের পাইকড়ায়। বাবা হারুনুর রশীদ খান ছিলেন পোস্টমাস্টার, মা রোকেয়া খানম। তাঁর মায়ের নামের পেছনে বেগম রোকেয়ার প্রভাব ছিল বলে তিনি জানান। শৈশব কেটেছে ময়মনসিংহের ফুলপুরে, পরে টাঙ্গাইলের বল্লা স্কুল ও এলেঙ্গায়। ১৯৬৩ সালে বল্লা করোনেশন হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর ইস্ট পাকিস্তান পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন, যেখান থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করেন।
নাটকের প্রতি তাঁর আকর্ষণ শুরু হয় যাত্রাপালা দেখে। তিনি বলেন, ‘অভিনেতাদের দেখে মনে হতো তারাই পৃথিবীর সর্বশক্তিমান মানুষ।’ স্কুলজীবনেই প্রথম নাটক লেখা শুরু করেন। ১৯৬৫ সালে পলিটেকনিক কলেজে তাঁর লেখা ‘মহানগরীতে একদিন’ নাটক মঞ্চস্থ হয়। পরে টেলিভিশনের নাটকের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় এবং ১৯৬৮ সালে প্রথম টেলিভিশন নাটক লেখেন প্রযোজক আবদুল্লাহ ইউসুফ ইমামের নির্দেশনায়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ঢাকায় ছিলেন। ২৫ মার্চের কালরাতে তিনি গ্রিন রোডের এক বাসায় আটকা পড়েন। পরে শাইনপুকুর, নবাবগঞ্জ হয়ে টাঙ্গাইলে যান। সেখানে কাদের সিদ্দিকীর সাথে যোগাযোগ করে অস্ত্র উদ্ধার ও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। পরে কুমিল্লা সিঅ্যান্ডবি বর্ডার দিয়ে ভারতে যান এবং আগরতলা হয়ে কলকাতায় পৌঁছান। সেখানে হাসান ইমামের সহায়তায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন। তাঁর লেখা ‘মৃত্যুহীন প্রাণ’ নাটকটি বেতারে সম্প্রচারিত হয়।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনি ‘আরণ্যক’ নাট্যদল প্রতিষ্ঠা করেন। মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটক দিয়ে যাত্রা শুরু হয়। তাঁর নিজের লেখা উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘ওরা কদম আলী’, ‘ওরা আছে বলেই’, ‘ইবলিশ’, ‘এখানে নোঙর’, ‘শ্বেতকাহিনী’ ও ‘একটি সেতুর গল্প’। তিনি টেলিভিশন ও রেডিওতেও অসংখ্য নাটক রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন।
বর্তমান বাংলাদেশের সংস্কৃতি চর্চা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দেশে ‘রুচির দুর্ভিক্ষ’ চলছে। তিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনার পুনরুদ্ধারের ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করায় সম্প্রীতিময় সমাজ নষ্ট হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে বর্তমান সরকার স্কুল-কলেজে সংস্কৃতি ও খেলাধুলার চর্চায় গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে তিনি সাবধান করে দিয়ে বলেন, শিক্ষক নিয়োগে যাতে দুর্নীতি না হয়। আদর্শবাদী শিক্ষকের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, গ্রামের স্কুলের শিক্ষকেরা কষ্টের মধ্যেও মূল্যবোধ ও জ্ঞানদানে অটল ছিলেন।
মামুনুর রশীদ তাঁর স্মৃতিচারণে কবি নির্মলেন্দু গুণ ও আবুল হাসানের সাথে তাঁর বন্ধুত্বের কথাও বলেন। তিনি নির্মলেন্দু গুণকে ঢাকায় এনে সাহিত্যচর্চায় উৎসাহিত করেন। সাক্ষাৎকারের শেষে তিনি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বই পড়া আন্দোলনের প্রশংসা করেন এবং আলোকিত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।




