বিরিয়ানি, পোলাও, জর্দা কিংবা মিষ্টি—বাঙালির রান্নায় সুগন্ধ বাড়াতে গোলাপজল ও কেওড়াজলের ব্যবহার বহুদিনের। কিন্তু সেই পরিচিত সুগন্ধিই এখন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে বিক্রি হওয়া কিছু পণ্যের গায়ে ‘ফুড গ্রেড’ বা ‘খাদ্যোপযোগী’ লেখা থাকলেও সেগুলো আসলে কী দিয়ে তৈরি, তার স্বচ্ছ তথ্য নেই বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। এমনকি এসব সুগন্ধি তৈরিতে কিডনি ডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহারের তথ্যও পেয়েছে সংস্থাটি। ফলে অনুমোদন ও সঠিক লেবেলিং ছাড়া বাজারে থাকা গোলাপজল ও কেওড়াজল খাবারে ব্যবহার না করার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে বিএফএসএ।
সংস্থাটির অভিযানে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। গত ১১ নভেম্বর রাজধানীর মিটফোর্ডে পরিচালিত মোবাইল কোর্টে গোলাপজল ও কেওড়াজল তৈরির একটি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ফ্লেভার ও রাসায়নিক পাওয়া যায়। কিছু বোতলে ‘ফুড গ্রেড’ লেখা থাকলেও খাদ্যে ব্যবহারের উপযোগীতার কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। পরবর্তীতে সরবরাহকারী আরেকটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে ‘সিনথেটিক গ্রেড’-এর ফ্লেভার ও রাসায়নিক শনাক্ত করা হয়, যা খাদ্যে ব্যবহারের অনুপযোগী। আরও উদ্বেগজনক তথ্য মেলে ডেমরার বাঁশেরপুল এলাকা থেকে। সেখানে হাইকো কনজ্যুমার প্রোডাক্টস নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কিডনি ডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশিয়ে কেওড়াজল, গোলাপজল ও অন্যান্য ফ্লেভার তৈরি করতে দেখা যায়। প্রতিষ্ঠানটিকে দুই লাখ টাকা জরিমানা এবং উৎপাদিত পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয় বিএফএসএ।
শুধু রাসায়নিকই নয়, পণ্যের লেবেল নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং প্রবিধানমালা ২০১৭ অনুযায়ী, খাদ্যে ব্যবহারযোগ্য সুগন্ধির লেবেলে ‘অনুমোদিত প্রাকৃতিক’, ‘অনুমোদিত কৃত্রিম’ বা উভয়টি উল্লেখ থাকতে হয়। কৃত্রিম সুগন্ধির ক্ষেত্রে সাধারণ নাম এবং ইনডেক্স বা আইএনএস নম্বরও দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাজারে থাকা অনেক পণ্যের লেবেলে শুধু ‘বিশুদ্ধ পানি’ ও ‘গোলাপ ফ্লেভার’ বা ‘কেওড়া ফ্লেভার’ লেখা থাকে। ফলে সেই সুগন্ধির প্রকৃত উপাদান বা উৎস সম্পর্কে ভোক্তার জানার কোনো উপায় থাকে না। বিএফএসএ জানিয়েছে, রেস্টুরেন্ট, বেকারি, কমিউনিটি সেন্টার ও ক্যাটারিং সার্ভিসসহ সব খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। তবে বাজারের সব গোলাপজল বা কেওড়াজল নিষিদ্ধ নয়—যেসব পণ্যে খাদ্যে ব্যবহারের অনুমোদন এবং লেবেলে প্রয়োজনীয় সব তথ্য সঠিকভাবে উল্লেখ থাকবে, সেগুলো ব্যবহার করা যাবে।
বিএফএসএর আইন ও নীতি বিভাগের সদস্য মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানান, সাধারণ ভোক্তারা কেওড়াজলকে প্রাকৃতিক বা ভেষজ মনে করলেও বাস্তবে এগুলো আমদানি করা রাসায়নিক দিয়ে তৈরি। মাঠপর্যায়ের মনিটরিং ও অভিযোগের ভিত্তিতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, মোবাইল কোর্টে কিডনি ডায়ালাইসিসের ক্ষতিকর কেমিক্যাল মিশিয়ে পণ্য উৎপাদনের প্রমাণ পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা করা হয়েছে। তবে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো বোতলের গায়ে ‘ফুড গ্রেড’ লেখায় সরাসরি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে জিজ্ঞাসা করলে তারা জানায়, এসব পণ্য খাদ্যের জন্য তৈরি করা হয় না—ধর্মীয় আচার বা মৃতদেহে ছিটানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু তাদের পণ্যে ‘নন-ফুড গ্রেড’ লেখার নির্দেশ দিলে তারা তা মানতে অস্বীকৃতি জানায়।
জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ভোক্তাদের মধ্যে গণসচেতনতা তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়ে আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, হোটেল-রেস্টুরেন্ট সতর্ক করার পাশাপাশি কমিউনিটি সেন্টার ও বিয়েবাড়ির বাবুর্চিদের তালিকা করে তাদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনার বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আইন অনুযায়ী, অননুমোদিত খাদ্য সংযোজন দ্রব্য ব্যবহার এবং সঠিক লেবেলিং না করা নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর ২৭ ও ৩২ ধারার অপরাধ। তাই শুধু ‘ফুড গ্রেড’ লেখা থাকলেই তা অনুমোদিত পণ্য হিসেবে বিবেচিত হবে না।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. ইকবাল রউফ মামুন। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকে বিরিয়ানি ও মাংসের রেজালায় এই সুগন্ধি ব্যবহার দেখে এসেছেন। এখন প্রস্তুতকারকেরা যদি বলেন এসব খাওয়ার জন্য তৈরি নয়, তাহলে বিএফএসএ-এর উচিত লেবেলে তা উল্লেখ করতে বাধ্য করা। কর্তৃপক্ষের হাতে সেই ক্ষমতা আছে। তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে নমুনা সংগ্রহ করে এসব পণ্যের নিরাপত্তা নিয়ে গবেষণার পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে ভোক্তাদের আরও কার্যকরভাবে সতর্ক করা যায়।




