দেশে হামের প্রকোপে প্রাণ হারিয়েছে ৮৮০ জন, যাদের প্রায় সবাই শিশু। গত ১৫ মার্চ থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত এই মৃত্যু ঘটেছে। এদের মধ্যে ফাইয়াজ হাসান তাজিম নামে ৮ মাস ১৮ দিন বয়সী এক শিশুও রয়েছে, যে গত ২২ এপ্রিল মারা যায়। তার মা ফারজানা ইসলাম আইভিএফ পদ্ধতিতে ১১ বছর পর সন্তানের মা হয়েছিলেন।

তিন মাস ধরে পরিচালিত এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার পেছনে দায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি। হামের ঝুঁকিকে অগ্রাধিকার না দেওয়া, টাইফয়েডের টিকাদান কর্মসূচির কারণে হাম-রুবেলার ক্যাম্পেইন বারবার পেছানো, প্রয়োজনের তুলনায় কম টিকা কেনা এবং ঝুঁকির তথ্য যথাসময়ে বিশ্লেষণ না করার কারণে সংকটটি ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের সমন্বয়হীনতা, ভুল অগ্রাধিকার ও প্রশাসনিক জটিলতাও এই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী বলে উঠে এসেছে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও তা বারবার পিছিয়ে ২০২৬ সালের এপ্রিলে শুরু হয়। অর্থাৎ ক্যাম্পেইনটি সাত মাস পিছিয়ে যায়। এর আগে ২০২০ সালে ক্যাম্পেইন হয়েছিল। টাইফয়েডের টিকাদানে বেশি জোর দেওয়ার কারণেই হামের ক্যাম্পেইন পিছিয়েছিল বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর স্বীকার করেছে।

২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নিয়মিত কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনের তুলনায় হাম-রুবেলার টিকা ৪২ শতাংশ কম কেনা হয়েছে। এ সময়ে মোট ৩ কোটি ৮৭ লাখ ডোজ টিকার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু কেনা হয়েছিল মাত্র ২ কোটি ২৪ লাখ ৯০ হাজার ডোজ। টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকা, প্রকৃত টিকাদানের হার সরকারি হিসাবের চেয়ে কম হওয়া এবং পরীক্ষাগারে হাম শনাক্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার তথ্য থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কোনো সতর্কবার্তা দেয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন, টিকা ক্রয় নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ইউনিসেফের সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দূরত্ব তৈরি হওয়ায় টিকা কেনায় বিলম্ব হয়। এছাড়া ২০২৫ সালে স্বাস্থ্যকর্মীদের একাধিক কর্মবিরতি ও ধর্মঘটের কারণে নিয়মিত টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং ক্যাম্পেইনও পিছিয়ে যায়।

প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর চলতি বছরের এপ্রিলে জাতীয় ক্যাম্পেইন হলেও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে বড় ঘাটতি ছিল। বিপুলসংখ্যক শিশু শুরুতেই হিসাবের বাইরে থেকে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের সভায় বলা হয়, বাংলাদেশে মারা যাওয়া শিশুদের ৯২ শতাংশ হামের কোনো টিকা পায়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছয় মাস বা তারও আগে হামের টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন শেষ করা সম্ভব হলে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিত না বা দেখা দিলেও তা এত ব্যাপক হতো না। সব শিশু টিকা পেলে সংক্রমণ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ত না বলে মত দিয়েছেন তারা।

আন্তসংস্থা সমন্বয় কমিটির (আইসিসি) ১৩টি সভার মধ্যে ১১টির কার্যবিবরণী বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সভাগুলোয় টাইফয়েডের টিকার ক্যাম্পেইন ধারাবাহিকভাবে গুরুত্ব পেলেও হামের সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাব নিয়ে কোনো পূর্বাভাস বা সতর্কতার বিষয়ে আলোচনা হয়নি। ২০২৪ সালের ১৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত আইসিসির ৬৭তম সভায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে হাম-রুবেলার ক্যাম্পেইন করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু পরবর্তী সভায় তা পেছানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

গত ২০ মে এক সংবাদ সম্মেলনে ইউনিসেফের প্রতিনিধি দাবি করেন, টিকার ঘাটতির কারণে প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে—এমন সতর্কবার্তা তারা অন্তর্বর্তী সরকারকে বারবার দিয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী বলেছিলেন, ইউনিসেফের করা যোগাযোগগুলোয় হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে কিছুই উল্লেখ ছিল না।

জাতীয় পর্যায়ে টিকা বিষয়ে সরকারকে কারিগরি পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্বে থাকা নাইট্যাগও হামের প্রাদুর্ভাবের বিষয়ে সরকারকে সতর্কবার্তা দেয়নি। এদিকে বিএনপি সরকারও হামের দুর্যোগকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা টিকার জন্য শিশুর সর্বনিম্ন বয়সসীমা ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাস করেছে, তবে এ ব্যাপারে প্রচার-প্রচারণা কম হয়েছে। টিকাদানযোগ্য শিশুর সংখ্যা নির্ণয়েও ভুল করেছে তারা। ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুর মধ্যে লক্ষ্যমাত্রায় রাখা হয়েছে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে, অর্থাৎ ৪৬ লাখ শিশুকে হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে।

জাতীয় হাম-রুবেলার টিকা ক্যাম্পেইনের শেষ দিনে ইউনিসেফের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল হাম নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে সংবাদ সম্মেলনের আড়াই মাস পরেও হাম নিয়ন্ত্রণে আসেনি। গত শনিবারও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১০ আগস্ট যোগাযোগ করা হলে ফাইয়াজ হাসান তাজিমের মা ফারজানা ইসলাম হাম কেন ছড়িয়ে পড়ল, তার তদন্ত ও বিচার দাবি করেন। তিনি বলেন, নিষ্পাপ শিশুরা মরে যাচ্ছে, কারও কোনো দায় নেই। পাঁচ মাসে আট শতাধিক শিশুর মৃত্যুর পরও কেউ দায় স্বীকার করেনি, দুঃখ প্রকাশ করেনি।