মাত্র এক সপ্তাহেই প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা আয়। ক্রিস্টোফার নোলান পরিচালিত ‘দ্য অডিসি’ বক্স অফিসে যে ঝড় তুলেছে, তা হলিউড ইতিহাসের অন্যতম সফল উদ্বোধনী সপ্তাহ। ১৭ জুলাই বিশ্বজুড়ে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি ইতোমধ্যে ৩৯০ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা) আয় করে ফেলেছে। বাংলাদেশেও সিনেমাটির প্রতি দর্শকদের আগ্রহ তুঙ্গে, প্রতিদিন ৫০টিরও বেশি শো প্রদর্শিত হচ্ছে এবং উদ্বোধনী সপ্তাহে প্রায় দুই কোটি টাকা ঘরে তুলেছে।

তিন হাজার বছর আগে গ্রিক কবি হোমারের লেখা ‘অডিসি’ নামক মহাকাব্যটি ঘরে ফেরার এক চিরন্তন গল্প। যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরতে চাওয়া এক ক্লান্ত সৈনিকের কাহিনি বারবার বলা হলেও নোলানের সংস্করণটি স্বতন্ত্র। তিনি মূল কাহিনির গুরুত্বপূর্ণ অংশ বজায় রেখে ওডেসিয়াসের চরিত্রে নতুনত্ব যোজনা করেছেন। এমিলি উইলসনের ইংরেজি অনুবাদের ছাপ স্পষ্ট রেখে তিনি হোমারের আত্মবিশ্বাসী যুদ্ধজয়ী বীরের পরিবর্তে একজন ক্লান্ত, অনুতপ্ত ও গভীর মানবিক চরিত্র নির্মাণ করেছেন। ফলত, যারা মূল মহাকাব্যের সাথে পরিচিত এবং যারা প্রথমবার গল্পটি দেখছেন—উভয়েই ভিন্ন মাত্রার অভিজ্ঞতা পাবেন।

সিনেমার সূচনা কোনো বিশাল যুদ্ধের দৃশ্য দিয়ে নয়। বরং এক চারণ কবি ট্রোজান যুদ্ধের গল্প শোনানোর মাধ্যমেই শুরু হয়, যার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ওডেসিয়াসের নিজের গল্প উন্মোচিত হয়। ম্যাট ডেমন অভিনীত ওডেসিয়াস ট্রোজান যুদ্ধের আট বছর পরও এক দ্বীপে স্মৃতিহীন হয়ে আটকে আছেন। অন্যদিকে, ইথাকায় তার স্ত্রী পেনেলোপে (অ্যান হ্যাথওয়ে) আঠারো বছর ধরে স্বামীর প্রত্যাবর্তনের আশায় অপেক্ষা করে চলছেন। তার ছেলে তেলেমাকাস (টম হল্যান্ড) বাবাকে ছাড়াই বড় হয়েছে। রাজপ্রাসাদ ভরে গেছে পেনেলোপের পাণিপ্রার্থীতে, কিন্তু তিনি এখনও আশা ছাড়েননি। সিনেমার বর্ণনায় এই চারটি সূত্র—ওডেসিয়াসের বর্তমান, যুদ্ধের স্মৃতি, ইথাকার অবস্থা এবং তেলেমাকাসের যাত্রা—একসাথে এগিয়ে চলে।

ওডেসিয়াসের যাত্রাপথে একে একে দেখা মেলে পৌরাণিক চরিত্রগুলো—একচোখা সাইক্লোপস, দৈত্য লায়েস্ট্রিগোনিয়ান, জাদুকরি সির্সি (সামান্থা মর্টন), ক্যালিপসো (শার্লিজ থেরন), সাইরেন এবং দেবী অ্যাথেনা (জেনডায়া)। নোলান এই পৌরাণিক বাধাগুলোকে নিছক রোমাঞ্চ হিসেবে নয়, বরং ওডেসিয়াসের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করেছেন। ছবিতে অপরাধবোধ আর ক্লান্তিমানবিক বীরের মনস্তাত্ত্বিক দিকটিই মুখ্য হয়ে উঠেছে।

প্রযুক্তিগত দিক থেকে ‘দ্য অডিসি’ একটি বৈপ্লবিক কাজ। এটি সম্পূর্ণ ৭০ মিমি আইম্যাক্স ক্যামেরায় ধারণ করা বিশ্বের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। হোয়টে ভ্যান হোয়টেমারের সিনেমাটোগ্রাফিতে সমুদ্রকে নীল ক্লিশে ভেঙে ভিন্ন রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে, আর প্রাচীন গ্রিক বাদ্যযন্ত্রে তৈরি লুডভিগ গোরানসনের আবহসংগীত মহাকাব্যিক পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়তা করেছে।

অভিনয় প্রসঙ্গে, ম্যাট ডেমন ক্লান্তি ও অপেক্ষায় ভেঙে পড়া এক মানুষের ছবি তার চোখে-মুখে নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অ্যান হ্যাথওয়ে সংযত কিন্তু দৃঢ় এক পেনেলোপে চরিত্রে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। স্বল্প সময়ের উপস্থিতিতেও সামান্থা মর্টনের সার্সি চরিত্রটি সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে। ক্ষুধার্ত নাবিকদের শূকরে পরিণত করার ভয়ংকর ও শৈল্পিক দৃশ্যে তার সংলাপ—যেখানে তিনি দাবি করেন তিনি মানুষকে শূকর নয়, বরং তাদের আসল রূপ প্রকাশ করেছেন—দর্শকদের নাড়া দেয়। রবার্ট প্যাটিনসন, টম হল্যান্ড এবং জন লেগুইজামোর মতো শিল্পীরাও সীমিত পরিসরে দ্যুতি ছড়িয়েছেন।

তবে প্রায় তিন ঘণ্টার এই সিনেমা সম্পূর্ণরূপে ত্রুটিহীন নয়। স্কিলা-চ্যারিবডিসের মতো কিছু পৌরাণিক পর্ব এবং যুদ্ধের দৃশ্যগুলো প্রয়োজনের তুলনায় দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ায় মহাকাব্যের বিশালতা কিছু জায়গায় অসম্পূর্ণ মনে হয়। নোলানের যুদ্ধের বিভীষিকা দেখানোর চেয়ে যোদ্ধার মনস্তত্ত্বে বেশি আগ্রহ থাকায় যুদ্ধের দৃশ্যগুলো অনেকটাই রক্তহীন ও পরিপাটি, যা গভীর প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়।

তবুও, ‘দ্য অডিসি’ শেষ পর্যন্ত দেবতা ও দানবের গল্প হয়ে ওঠেনি; বরং হয়ে উঠেছে নিজের ভেতরের লড়াইয়ে লিপ্ত এক ক্লান্ত মানুষের হৃদয়স্পর্শী কাহিনি। চলচ্চিত্রজীবনে নোলান বারবার ঘরে ফেরা ও স্মৃতির গল্প বলেছেন। সমালোচকদের মতে, নোলানের পুরো ক্যারিয়ার যেন এই ‘অডিসি’ নির্মাণেরই প্রস্তুতি ছিল। সাইক্লোপস থেকে সার্সি—দৈত্য ও জাদুকরি দেখে মনে হয় মেক্সিকান নির্মাতা গিয়ের্মো দেল তোরোর প্রেরণার ছাপ স্পষ্ট। সত্তরেরও বেশি বছর পর হলিউডে হোমারের মহাকাব্যের এই প্রত্যাবর্তন একই সঙ্গে দর্শকের চোখ ও মন—উভয়ই ভরিয়ে দেয়।