পবিত্র আরাফাত দিবসে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে মরুর প্রান্তর। সৌদি আরবের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ৯ জিলহজ; হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ দিনে ফজরের নামাজ শেষ করেই মিনার সাদা তাঁবু ছেড়ে আরাফাতের ময়দানের দিকে অগ্রসর হন লাখো হাজি। পৃথিবীর ভিন্ন প্রান্ত, ভিন্ন ভাষার মানুষ একই ইহরামের শুভ্র পোশাকে, একই মিনতিতে সমবেত হয়েছেন আরাফাতের প্রান্তরে।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বাণী অনুসারে ‘আরাফাতে অবস্থানই হলো হজ’। মুসলমানদের বিশ্বাস, এদিনে মহান সৃষ্টিকর্তা অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বান্দাকে ক্ষমা করেন। এই দিনটির আবহেই এক বাংলাদেশী হাজি গত বছরের স্মৃতিচারণ করে তুলে ধরেছেন ২০২৫ সালের ৫ জুনের অভিজ্ঞতার কথা। ফজপের নামাজ শেষে মিনার তাঁবু থেকে আরাফাতের পথে রওনা দিলে দূর থেকে দৃশ্যটি মনে হয়েছিল যেন মরুভূমির বুকে সাদা সাগর বয়ে চলেছে। প্রতিটি হাজির ঠোঁটে তালবিয়ার সুর, চোখে-মুখে এক অন্যরকম প্রশান্তির ছাপ।
আরাফাতে পৌঁছে দেখা যায়, মিনার ক্ষুদ্র তাঁবুর বদলে এখানকার আবাসন বিশাল আকারের, যেখানে কয়েক শ মানুষ একত্রে অবস্থান করেন। নারীদের জন্য নির্ধারিত পৃথক অংশে প্রত্যেকের জন্য ছিল স্লিপিং ব্যাগ, ছাতা ও কাপড়ের ব্যাগ। বিছানাগুলো ভাঁজ করে বসার উপযোগী ব্যবস্থা ছিল। ২০২৬ সালের ২৬ মের অভিজ্ঞতা বর্ণনায় তিনি বলেন, দিনের শুরুতে আরামদায়ক পরিবেশ থাকলেও সূর্য ওপরে ওঠার সাথে সাথে মরুর দাবদাহ ভয়ংকর রূপ নেয়। তাঁবুর ভেতরে চলমান একাধিক শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রও তীব্র উত্তাপের কাছে পরাস্ত হতে থাকে।
ওয়াশরুমের সামনে দীর্ঘসারি সত্ত্বেও কারও মুখে বিরক্তির রেখা দেখা যায়নি; বরং সবাই ছিলেন নিজের ভেতর গভীর ধ্যানে নিমজ্জিত। স্থানীয় আবহাওয়া দপ্তরের তরফ থেকে মোবাইলে সতর্কবার্তা আসে যে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বাইরে বের হলে জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কিন্তু মন তবুও বারবার তাঁবুর বাইরের দিকে টেনে নিয়ে যায়। কিছু গাছের ছায়ায় অনেকে তসবিহ পাঠ, কোরআন তিলাওয়াত কিংবা নীরবে আকাশপানে চেয়ে সময় কাটান।
আরাফাতের খুতবার ধ্বনি ভেসে আসার পর সমগ্র চিত্রটি বদলে যায়। ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে সবাই মোনাজাতের জন্য দাঁড়িয়ে পড়েন। কেউ কেউ গাছতলায় বসে কাঁদছেন, কেউ নিঃশব্দে হিসাব দিচ্ছেন জীবনের। এক বন্ধ হাজির বর্ণনা করেছেন, ৪৫ জনের অপরিচিত দলটি কীভাবে একদিনেই যেন পরস্পরের আপনজন হয়ে ওঠে। ঢাকার খিলগাঁও থেকে আসা হাকিম মজুমদার, জামালপুরের মির্জা কানন, পিরোজপুরের বাবুল মিয়া, ফেনির রানা, চাঁপাইনবাবগঞ্জের তৌহিদুল ইসলাম এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা ইউসুফ মজুমদার— সবাই একে অপরের দুঃখ-কষ্টের শরিক হন। একজন কাঁদলে আরেকজনের চোখ ভিজে ওঠে।
তাদের সঙ্গী ছিলেন ঢাকার এক স্বনামধন্য মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মুহতাসিম বিল্লাহ, যিনি বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন যে আজকের দিনটি শুধুই চাওয়ার দিন, এই পবিত্রতম দিনে আল্লাহ সবচেয়ে বেশি বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। তার কথাগুলো সবার বুকে গভীরভাবে দাগ কাটে। দলনেতা মাহফুজুর রহমান মজুমদার নানা বয়োজ্যেষ্ঠদের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিচ্ছিলেন।
বিকেলে সূর্য যখন পশ্চিমে হেলে পড়ে, তখন সেই ক্ষণটিকে আরও দীর্ঘ করার আকুতি জাগে প্রতিটি মনে। একসময় দেশে ফোন করে জানতে পারেন, বড় বোনের স্বামী সম্প্রতি মারা গিয়েছেন, ছেলেটি বহু বছর ধরে নিখোঁজ। তারই মধ্যে জানা যায়, তাঁর মেজ ভাই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। পরিবারের সদস্যরা যাতে তাঁর ইবাদতে বিঘ্ন না ঘটে, সেজন্য খবরটি গোপন করেছিলেন। এ কথা শুনে বুক ভেঙে যায় তার, আবারও দুই হাত তুলে কান্না শুরু করেন। এই আরাফাতের প্রান্তরেই আজ থেকে প্রায় ১৪০০ বছর আগে বিদায় হজের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন মহানবী (সা.), যা আজও উম্মাহর জন্য পথনির্দেশ। এ দিনটির স্মৃতি হয়ে ওঠে এক বিশাল ইতিহাসের সাথে আত্মিক সংযোগের।
এ বছরের প্রস্তুতি নিয়েও তথ্য মেলে; জানা গেছে, তীব্র গরম মোকাবেলায় কুলিং ইউনিটের পাশাপাশি বাড়তি ছায়াযুক্ত স্থান ও মেডিক্যাল ক্যাম্পের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলেও লাখো মানুষ ধৈর্যের সাথে দিনটি কাটিয়েছেন, কারণ তাদের বিশ্বাস আজ আল্লাহ বান্দাকে সবচেয়ে বেশি ক্ষমা করবেন। সূর্যাস্তের পর হাজিরা এখন রওনা হবেন মুজদালিফার দিকে, যেখানে খোলা আকাশের নিচে কাটবে রাত এবং সংগ্রহ করা হবে ছোট ছোট পাথর, যা দিয়ে মিনায় শয়তানকে প্রতীকী নিক্ষেপ করা হবে। এই অভিজ্ঞতার অন্য অনুভূতি ও রাতের গল্প এখনও অধরা রইল।




