আরএনএ ইন্টারফেরেন্স বা আরএনএআই (RNAi) কোষের এক প্রাকৃতিক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে যে কোনো নির্দিষ্ট জিনের কার্যকারিতা বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব। এটি মূলত একটি প্রতিরক্ষা পদ্ধতি, যা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য বিবর্তনের পথে তৈরি হয়েছে। কোষের ভেতরে এমআরএনএ (mRNA) নামের বার্তাবাহক অণু প্রোটিন তৈরির নির্দেশনা বহন করে। আরএনএআই প্রক্রিয়ায় সেই এমআরএনএ-কে ধ্বংস করে দেওয়া হয়, ফলে সংশ্লিষ্ট প্রোটিনটি আর তৈরি হতে পারে না। এই সহজ কিন্তু শক্তিশালী ব্যবস্থাটি আবিষ্কারের পেছনে রয়েছে এক অদ্ভুত ব্যর্থতার গল্প।
১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে পেটুনিয়া ফুলের রঙ নিয়ে কাজ করছিলেন একদল উদ্ভিদ বিজ্ঞানী। তারা চেয়েছিলেন ফুলের বেগুনি বর্ণ আরও গাঢ় করতে। সে লক্ষ্যে রঙ উৎপাদনকারী জিনের অতিরিক্ত কপি গাছে প্রবেশ করানো হয়। আশা ছিল, জিনের সংখ্যা বাড়লে রঙ আরও গাঢ় হবে। কিন্তু ফলাফল ছিল পুরোপুরি বিপরীত। ফুল গাঢ় বেগুনি না হয়ে একেবারে সাদা হয়ে গেল। কোনো কোনো ফুলে দেখা গেল বেগুনি ও সাদার মিশ্রণ। বিজ্ঞানীরা প্রথমে হতবাক হয়ে গেলেন। পরে পরীক্ষা করে দেখা গেল, শুধু নতুন জিনই নয়, গাছের নিজস্ব রঙ উৎপাদনকারী জিনও কম সক্রিয় হয়ে গেছে। এই ঘটনাকে তারা 'কো-সাপপ্রেশন' নাম দিলেন। আসলে কী ঘটছিল, তা তখন কেউ বুঝতে পারেননি।
ঠিক একই রকম ঘটনা পরে ছত্রাক ও অন্যান্য প্রাণীতেও দেখা গেল। কোনো জিনের অতিরিক্ত কপি দিলে সেই জিনের কাজ কমে যাচ্ছিল। গবেষকেরা বুঝতে পারলেন, এটি কোনো পৃথক পৃথক ঘটনা নয়, বরং একটি সাধারণ প্রক্রিয়ার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া কী, তা রহস্যেই রহস্য।
মধ্য-১৯৯০-এ এসে কৃমি 'সি-এলিগ্যান্স' (Caenorhabditis elegans) নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছিলেন অ্যান্ড্রু ফায়ার ও ক্রেইগ মেলো। তারা অ্যান্টিসেন্স আরএনএ ব্যবহার করে জিনের কাজ বন্ধ করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তারা লক্ষ্য করলেন, সেন্স আরএনএ ব্যবহার করলেও একই ফল পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষা (কন্ট্রোল) থেকেও জিন সাইলেন্সিং দেখা যাচ্ছে। এটি তাদের ভাবিয়ে তুলল। তারা সন্দেহ করলেন, একক আরএনএ নয়, বরং সম্ভবত দুইটি আরএনএ একত্রিত হয়ে ডাবল-স্ট্র্যান্ডেড আরএনএ (dsRNA) তৈরি করছে, আর সেটিই আসল কারণ।
এই অনুমান যাচাই করতে ফায়ার ও মেলো আলাদাভাবে সেন্স আরএনএ, অ্যান্টিসেন্স আরএনএ এবং ডিএস আরএনএ ব্যবহার করে কৃমির ওপর পরীক্ষা চালান। ফলাফল স্পষ্ট—শুধু ডিএস আরএনএই জিন বন্ধ করতে সক্ষম, একক আরএনএ তেমন কার্যকর নয়। তাঁদের এই গবেষণাপত্র ১৯৯৮ সালে 'সায়েন্স' জার্নালে প্রকাশিত হয়। এটি প্রমাণ করে যে, উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয় ক্ষেত্রেই ডিএস আরএনএ জিন সাইলেন্সিংয়ের মূল চাবিকাঠি। এর মাধ্যমেই পেটুনিয়ার রহস্যও উন্মোচিত হয়—অতিরিক্ত জিন প্রবেশের ফলে কোষে ডিএস আরএনএ-সদৃশ গঠন তৈরি হয়েছিল, যা কোষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে দেয়।
এখন প্রশ্ন হলো, কোষের ভেতরে ডিএস আরএনএ প্রবেশের পর আসলে কী ঘটে? কোষের একটি বিশেষ প্রোটিন 'ডাইসার' (Dicer) সেই ডিএস আরএনএ-কে ছোট ছোট টুকরোয় কেটে ফেলে। প্রতিটি টুকরোর দৈর্ঘ্য ২১-২৩ নিউক্লিওটাইড। এগুলো 'সাইআরএনএ' (siRNA) নামে পরিচিত। এরপর এই সাইআরএনএ একটি প্রোটিন কমপ্লেক্স 'রিস্ক' (RISC)-এর সঙ্গে যুক্ত হয়। রিস্ক কমপ্লেক্স কোষে ঘুরে ঘুরে এমন কোনো এমআরএনএ খুঁজতে থাকে, যার নিউক্লিওটাইড ক্রম সাইআরএনএ-র সঙ্গে মেলে। মিল পাওয়া মাত্রই রিস্কের অন্তর্গত 'আর্গোনাট ২' প্রোটিন সেই এমআরএনএ-কে কেটে টুকরো করে দেয়। ফলে সে এমআরএনএ আর প্রোটিন তৈরি করতে পারে না। অর্থাৎ যেন একটি চিঠি পৌঁছানোর আগেই সেটি নষ্ট করে দেওয়া হলো।
এই প্রক্রিয়া উদ্ভিদের জন্য ভাইরাস প্রতিরোধের একটি ঢাল হিসেবে কাজ করে। কারণ ভাইরাস প্রতিলিপি তৈরির সময় ডিএস আরএনএ তৈরি করে, আর কোষের সেই ডিএস আরএনএ চিহ্নিত করে ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়।
আরএনএআই আবিষ্কার জীববিজ্ঞানের চিন্তাধারা বদলে দিয়েছে। এর আগে জিনের কাজ বুঝতে গবেষকদের দীর্ঘমেয়াদি মিউটেশন বা নকআউট মডেলের ওপর নির্ভর করতে হতো। আরএনএআই সেই প্রক্রিয়াকে অনেক দ্রুত ও নমনীয় করে তুলেছে। বিশেষ করে মানব জিনোম সিকোয়েন্স সম্পন্ন হওয়ার পর আরএনএআই-ভিত্তিক স্ক্রিনিং-এর মাধ্যমে একসঙ্গে অসংখ্য জিনের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।
২০০৬ সালে অ্যান্ড্রু ফায়ার ও ক্রেইগ মেলো তাঁদের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
চিকিৎসাশাস্ত্রে আরএনএআই-এর সম্ভাবনা বিপুল। বেশিরভাগ ওষুধ তৈরি হয়ে যাওয়া প্রোটিনকে লক্ষ্য করে কাজ করে। কিন্তু আরএনএআই প্রোটিন তৈরির আগেই তার নির্দেশ (mRNA) ধ্বংস করে দেয়। প্রাথমিকভাবে ডেলিভারি ও স্থায়িত্বের সমস্যা ছিল, কারণ শরীর আরএনএ-কে দ্রুত ভেঙে ফেলে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা পরে লিপিড ন্যানোপার্টিকল (LNP)-এর মতো সুরক্ষিত আবরণে সাইআরএনএ ঢুকিয়ে কোষে পৌঁছানোর কৌশল বের করেন।
বর্তমানে বিরল জিনগত রোগ, ক্যান্সার ও লিভার জটিলতা নিরাময়ে আরএনএআই-ভিত্তিক ওষুধ ক্লিনিক্যাল ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে। কৃষিক্ষেত্রেও পোকামাকড় ও ভাইরাস প্রতিরোধে আরএনএআই কৌশল ব্যবহার হচ্ছে।
সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়েছে জিন নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে মৌলিক ধারণায়। কোষ শুধু বাইরের আরএনএ-র বিরুদ্ধেই এই ব্যবস্থা ব্যবহার করে না, নিজের ভেতরেও একই ধরনের নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করে—যাকে বলে মাইক্রো আরএনএ (miRNA)। মাইক্রো আরএনএ কোষের ভেতরে জিনের প্রকাশের ভলিউম নিয়ন্ত্রণের মতো কাজ করে।
পেটুনিয়া ফুলের এক ব্যর্থ পরীক্ষা থেকে শুরু হওয়া এই গল্প প্রমাণ করে, প্রকৃতির কোনো ভুলই বৃথা যায় না। বড় আবিষ্কার সব সময় জটিল প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না; কখনো কখনো তা জন্ম নেয় সাধারণ ল্যাবের টবে ফুটে থাকা এক সাদা ফুলের রহস্য থেকে।




