মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়েছে। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো সৌরজগতের বাইরে একটি পাথুরে গ্রহের চারপাশে বায়ুমণ্ডলের অস্তিত্ব সরাসরি নিশ্চিত করেছেন। পৃথিবী থেকে ৪৯ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এই গ্রহটি ‘এলএইচএস ১১৪০বি’ নামে পরিচিত, যার ভর আমাদের পৃথিবীর চেয়ে ৫ দশমিক ৬ গুণ বেশি এবং ব্যাসার্ধ প্রায় ৭০ শতাংশ বড়। গ্রহটি ‘কেটাস’ (তিমি) নক্ষত্রমণ্ডলের একটি লাল বামন নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, যা সূর্যের তুলনায় আকারে ছোট ও কম উজ্জ্বল হলেও প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকর আয়নাইজিং বিকিরণ নির্গত করে। ২০১৭ সালে আবিষ্কৃত এই গ্রহটি তার নক্ষত্রের সঙ্গে জোয়ারভাটার মতো আটকে থাকায় এক পিঠ সবসময় নক্ষত্রের দিকে মুখ করে থাকে, যেমন চাঁদের এক পিঠ পৃথিবীর দিকে থাকে।
এই আবিষ্কারের মূল ভিত্তি ছিল চিলির লাস ক্যাম্পানাস অবজারভেটরিতে অবস্থিত ম্যাগেলান ক্লে টেলিস্কোপের ইনফ্রারেড স্পেকট্রোগ্রাফের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ। ২০২৪ সালে গ্রহটি যখন তার নক্ষত্রের সামনে দিয়ে পার হচ্ছিল, তখন বিজ্ঞানীরা এর বায়ুমণ্ডল থেকে হিলিয়াম গ্যাস মহাকাশে নির্গত হতে দেখেন। কিন্তু ২০২৫ সালের পর্যবেক্ষণে কোনো হিলিয়াম নির্গমন ধরা পড়েনি, যা প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞানীদের জন্য ধাঁধা তৈরি করে। পুনর্বিশ্লেষণের মাধ্যমে তারা নিশ্চিত হন যে এটি বায়ুমণ্ডলের উপস্থিতিরই প্রমাণ। গবেষণাপত্রটি ‘সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণার প্রধান লেখক ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক গবেষক ড. কলিন চেরুবিন জানিয়েছেন, বাসযোগ্য অঞ্চলের কোনো পাথুরে গ্রহের বায়ুমণ্ডল সরাসরি পর্যবেক্ষণে পাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। এর আগে কেবল গ্যাসীয় দানব বা সাব-নেপচুন গ্রহের বায়ুমণ্ডল শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। বাসযোগ্য অঞ্চল বলতে নক্ষত্রের চারপাশের এমন দূরত্ব বোঝানো হয় যেখানে তাপমাত্রা তরল পানি ধরে রাখার জন্য অনুকূল। এই গ্রহের তাপমাত্রা তরল পানি থাকার মতো, এবং এর বায়ুমণ্ডল পানি উড়ে যাওয়া ঠেকানোর পাশাপাশি ক্ষতিকর বিকিরণ থেকেও পৃষ্ঠকে রক্ষা করছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক জেন বার্কবি এই আবিষ্কারকে অসাধারণ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, মহাবিশ্বে লাল বামন নক্ষত্রের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, এবং এদের বাসযোগ্য অঞ্চলে থাকা পাথুরে গ্রহগুলোই প্রাণের সন্ধানের সবচেয়ে বড় সুযোগ। তবে সাধারণত এই নক্ষত্রগুলো অত্যন্ত সক্রিয় থাকে, যার ফলে তাদের গ্রহগুলোর বায়ুমণ্ডল ঝড়ে উড়ে যায়। এলএইচএস ১১৪০বি-র ক্ষেত্রে তার নক্ষত্র তুলনামূলক শান্ত, যা বায়ুমণ্ডল টিকে থাকার পক্ষে সহায়ক। একই নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে আরেকটি পাথুরে গ্রহ থাকলেও সেটির বায়ুমণ্ডল নেই।
এই গ্রহে পৃথিবীর চেয়ে অনেক বেশি পানি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এর বায়ুমণ্ডলের গঠনও ভিন্ন হতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এই পর্যবেক্ষণ শুধু গ্রহের উপরের বায়ুমণ্ডলের গ্যাস হারিয়ে যাওয়া নিয়ে; পৃষ্ঠের কাছাকাছি অঞ্চলের তথ্য এতে নেই, যেখানে সাধারণত প্রাণের বিকাশ ঘটে। তাই সরাসরি প্রাণের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তবুও, এই আবিষ্কার প্রাণের সন্ধানের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।




