মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর, যিনি প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়কার ঘটনাপ্রবাহ ও সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আন্দোলনের সবচেয়ে নির্ধারক মুহূর্তটি ছিল যখন সরকার সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে তিনি উল্লেখ করেন, সেনাবাহিনী দিয়ে গণ-আন্দোলন দমন করা খুবই কঠিন। সেনাবাহিনী মাঠে নামার পর জনগণ তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে না নিয়ে বরং হাত মেলানো ও সাঁজোয়া যানে ওঠার মতো আচরণ সেনা সদস্যদের প্রভাবিত করে। তিনি মনে করেন, সেনাবাহিনীর সদস্যরাও এই সমাজের অংশ, তাদের পরিবারও একই পরিস্থিতির মধ্যে ছিল। তাই নিজ দেশের সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালানো তাদের জন্য সহজ ছিল না।
৩ আগস্ট সেনাপ্রধানের দরবার সম্পর্কে আকবর বলেন, সেনাপ্রধান সম্ভবত আগেই বাহিনীর মনোভাব বুঝতে পেরেছিলেন, কিন্তু কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার পর অধস্তন কর্মকর্তা ও সৈনিকদের মানসিক অবস্থান সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পান। ওই বৈঠক থেকেই বোঝা যায়, জনগণের ওপর নির্বিচার গুলি চালানোর নির্দেশ গ্রহণযোগ্য হবে না। তিনি আরও জানান, ৪ আগস্ট রাত ১২টা ২০ মিনিটে সেনাপ্রধান তাকে ফোন করে পরদিন সকাল ১০টায় দেখা করতে বলেন।
৫ আগস্ট সকালে সেনাপ্রধানের বাসভবনে বৈঠকে তিনি তিনটি বিষয় স্পষ্ট করেন: তিনি আর কোনো রক্তপাত চান না, নিজে ক্ষমতা নিতে চান না এবং চলমান সংকটের রাজনৈতিক সমাধান চান। সেনাপ্রধান তাকে প্রধান রাজনৈতিক নেতাদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে এবং তাদের আলোচনার জন্য প্রস্তুত করতে বলেন। আকবর উল্লেখ করেন, সেনাপ্রধানের কথায় সামরিক শাসন বা ক্ষমতা গ্রহণের কোনো ইঙ্গিত ছিল না, বরং তিনি বারবার রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেন।
সেনাপ্রধানের বাসভবন থেকে বেরিয়ে তিনি প্রথমে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ফোন করেন এবং পরে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান, মাহমুদুর রহমান মান্না, জোনায়েদ সাকিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বেলা দেড়টার দিকে সেনা সদর থেকে রাজনৈতিক নেতাদের দ্রুত সেনাপ্রধানের দপ্তরে আসতে বলা হলে তিনি সবাইকে ফোন করে জানান। সেনা সদরে গিয়ে তিনি জি এম কাদের, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মির্জা ফখরুল, শফিকুর রহমান, মাহমুদুর রহমান মান্না, জোনায়েদ সাকি, মামুনুল হকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ইসলামী দলের নেতাদের দেখতে পান। একপর্যায়ে সেনাপ্রধান জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন।
এরপর সবাই বঙ্গভবনে যান। সেখানে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে বৈঠকে খালেদা জিয়ার মুক্তি, পুলিশ বাহিনীর পুনর্বাসন, আকাশপথ বন্ধ করা এবং আয়নাঘর থেকে বন্দীদের মুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। আকবর জানান, তিনি পুলিশের অতিরিক্ত দমন-পীড়নে জড়িত কয়েকজনকে আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তারের প্রস্তাব দেন। এছাড়া অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দেশত্যাগ রোধে আকাশসীমা ও বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দেন। আয়নাঘরের বন্দীদের মুক্তির বিষয়টি তিনি রাষ্ট্রপতির সামনে তুললে সেনাপ্রধান ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
আকবর আরও বলেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর ভেতরে সম্ভাব্য অস্থিরতা এড়াতে তিনি কাজ করেন। তিনি ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেন। তার মতে, জনগণের ভালোবাসা ও আস্থা ফিরে পাওয়ার পর আগের সরকার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা সেনাবাহিনীর ভেতরেই বিদ্রোহাত্মক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারত। তিনি অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের ভূমিকাকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেন, যা সেনাবাহিনীর সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।




