অনলাইনে কোনো কিছু খোঁজার সময় গুগলের সার্চ তালিকার একদম উপরের লিংকটিকে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ভাবা একটি সাধারণ ধারণা। কিন্তু এই ধারণা এখন ব্যবহারকারীদের জন্য বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনছে। সার্চ ফলাফলের শীর্ষে থাকা স্পনসরড লিংকগুলোতে সব সময় নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট নাও থাকতে পারে, বরং এগুলো অর্থের বিনিময়ে সবার ওপরে জায়গা করে নেয়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রতারক চক্র এখন সাইবার জালিয়াতির নতুন কৌশল অবলম্বন করছে।
প্রতিষ্ঠিত ও সুপরিচিত কোম্পানির নাম ব্যবহার করে প্রতারকেরা ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে গুগলে তা স্পনসরড অ্যাড হিসেবে প্রচার করছে। এসব নকল সাইটের নকশা, লোগো, রঙের বিন্যাস এবং ভাষা এতটাই দক্ষতার সাথে আসলটির অনুরূপ তৈরি করা হয় যে, অভিজ্ঞ ব্যবহারকারীরও কখনও কখনও ধোঁকা খেয়ে যান। শুধু ওয়েব ঠিকানায় কোনো অতিরিক্ত অক্ষর বা সামান্য বানান পরিবর্তনই একমাত্র সূত্র হতে পারে।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ভুয়া ওয়েবসাইটগুলোতে নকল পণ্য বিক্রয় করা হয় না, বরং এর পেছনে উদ্দেশ্য থাকে আরও সুদূরপ্রসারী। এগুলোর মাধ্যমে ব্যবহারকারীর ক্রেডিট কার্ডের তথ্য, লগইন ক্রেডেনশিয়াল এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীতে সেই তথ্য কাজে লাগিয়ে গোপনে অর্থ হরণ, বিভিন্ন অনলাইন অ্যাকাউন্টে অনুপ্রবেশ অথবা পরিচয় জালিয়াতির মতো অপরাধ সংঘটিত হয়। এ ধরনের প্রতারণা কেবল গুগলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বিংয়ের মতো অন্যান্য সার্চ ইঞ্জিন এবং ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও একই ধরনের ভুয়া স্পনসরড বিজ্ঞাপন দেখা যেতে পারে।
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইবার নিরাপত্তা-গবেষক ডেমন ম্যাককয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রতারণামূলক সাইটগুলো প্রায়ই এমন পেমেন্ট পদ্ধতি ব্যবহার করতে বলে যেখান থেকে অর্থ ফেরত পাওয়া দূরূহ। আকর্ষণীয় বড় ছাড়ের প্রলোভন দেখিয়ে ব্যবহারকারীকে ব্যাংক ট্রান্সফার বা প্রচলিত মাধ্যমের বাইরে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করা হয়। এমনকি ফোন নম্বর, পাসওয়ার্ড ও ঠিকানার মতো তথ্যাদিও এসব সাইটে চাওয়া হতে পারে। পরে সেই তথ্য ব্যবহার করেই বড় ধরনের প্রতারণার ঘটনা ঘটানো হয়।
প্রতারণা দমনে গুগলের তৎপরতা
ভুয়া বিজ্ঞাপনের প্রকৃত পরিসংখ্যান জানা কঠিন, কারণ অধিকাংশই সাধারণ দর্শকের নজরে আসার আগেই সরিয়ে ফেলা হয়। গুগলের দেওয়া তথ্যমতে, পূর্ববর্তী বছরপ্রতিষ্ঠানটি প্রতারণার সাথে জড়িত ৬০২ কোটিরও বেশি বিজ্ঞাপন এবং ৪০ লাখের বেশি অ্যাকাউন্ট অপসারণ করেছে। পাশাপাশি, বিজ্ঞাপন প্রকাশের আগে দাতার পরিচয় নিশ্চিতকরণের পদ্ধতিও আরও কঠোর করা হয়েছে।
ব্যবহারকারীরা কীভাবে সাবধান থাকবেন, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, ওয়েবসাইটে যদি 'মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে অফার শেষ' বা 'তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা না নিলে তথ্য হারিয়ে যাবে'- এমন তাড়াহুড়া সৃষ্টিকারী বার্তা দেখা যায়, তবে সতর্ক হওয়া আবশ্যক। ওয়েব ঠিকানা সতর্কতার সাথে পরীক্ষা করতে হবে; সুপরিচিত কোনো ব্র্যান্ডের নামের সঙ্গে ছোটখাটো বানান ভুল, অতিরিক্ত শব্দ বা সংখ্যা যুক্ত থাকলে সেটি প্রতারণার ইঙ্গিত। এছাড়াও অস্বাভাবিক রকম কম মূল্যের অফার, নির্দিষ্ট কিছু বিকল্প মাধ্যমেই কেবল অর্থ প্রদানের অনুরোধ, এবং সাইটজুড়ে বানান ও ভাষাগত ত্রুটি দেখলে ধরে নিতে হবে তা নকল।
অনলাইনে কেনাকাটার বা তথ্য খোঁজার সময় স্পনসরড লিংকে ক্লিক করার পূর্বে ওয়েব ঠিকানা ভালোভাবে যাচাই করার পরামর্শ দিচ্ছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। সম্ভাব্য হলে স্পনসরড অংশ এড়িয়ে স্বাভাবিক অনুসন্ধান ফলাফল থেকেই প্রতিষ্ঠানের সাইটে প্রবেশ করতে হবে। যদি কখনো ভুলবশত কোনো ভুয়া সাইটে আর্থিক লেনদেন করে ফেলেন বা ব্যক্তিগত তথ্য প্রদান করেন, তাহলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা কার্ড প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এক্ষাে কার্ডটি বন্ধ করে নতুন কার্ড নেওয়ার পাশাপাশি ওইসব অনলাইন অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা এবং সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ দায়ের করাও অপরিহার্য।




