সময়ের অদম্য গতিকে জয় করার স্বপ্ন থেকে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিতে জন্ম নিয়েছে দুটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ধারণা: টাইম ট্রাভেল এবং টাইম লুপ। সাহিত্যের পাতা থেকে রুপালি পর্দা, এমনকি পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণাগার পর্যন্ত এই বিষয় দুটি যুগে যুগে মানুষকে কৌতূহলী করে রেখেছে। তবে এই দুইয়ের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু মৌলিক পার্থক্য আছে। টাইম ট্রাভেল হলো সময়ের সরলরেখা বরাবর অতীত বা ভবিষ্যতে যাতায়াত করার ক্ষমতা; অন্যদিকে টাইম লুপ হলো সময়ের একটি নির্দিষ্ট অংশে বারবার আবদ্ধ হয়ে পড়া।
এইচ জি ওয়েলসের ১৮৯৫ সালের উপন্যাস 'দ্য টাইম মেশিন' প্রথম বৈজ্ঞানিক পন্থায় সময় ভ্রমণের ধারণার সূচনা করে। পরবর্তীতে 'ব্যাক টু দ্য ফিউচার'-এর মতো হলিউডের ছবিতে ডক্টর এমেট ব্রাউন ও মার্টি ম্যাকফ্লাইয়ের একটি গাড়িতে চড়ে অতীত-ভবিষ্যতে ঘুরে বেড়ানোর গল্প দর্শকদের বিমোহিত করেছে। আধুনিক যুগে নেটফ্লিক্সের জটিল সিরিজ 'ডার্ক', মার্ভেলের 'অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম' কিংবা বাংলাদেশের 'কালপুরুষ' সিরিজ—সবখানেই সময় ভ্রমণকে নানামাত্রিক ও গাণিতিক রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব কাহিনী একটি মৌলিক প্রশ্ন জাগায়: অতীতে গিয়ে সত্যিই কি কোনো কিছু বদলে ফেলা সম্ভব? এবং যদি সম্ভব হয়, তাহলে কি বর্তমানেও তার কোনো প্রভাব পড়বে?
সময় চক্রের বিষয়ে আলোচনা আসলে ১৯৯৩ সালের চলচ্চিত্র 'গ্রাউন্ডহগ ডে'-র কথা অনিবার্যভাবে উঠে আসে, যেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্রটি একই দিনে বারবার আটকে পড়ে। টম ক্রুজ অভিনীত সায়েন্স ফিকশন ছবি 'এজ অব টুমরো'-তে ভিনগ্রহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রতি মৃত্যুর পর নায়কের একই দিনের শুরুতে ফিরে আসার গল্প দেখানো হয়েছে। 'বডিজ' সিরিজটিতে দেখা যায়, ডেফো নামের এক বিজ্ঞানী অতীতে গিয়ে চারটি পৃথক সময়ে বিভক্ত হয়ে পড়েন। পরিচালকের নিখুঁত উপস্থাপনার কারণে এই আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব ও এলোমেলো ঘটনাও বাস্তব মনে হতে পারে।
টাইম ট্রাভেলের যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করতে গেলে দুটি বিখ্যাত প্যারাডক্স সামনে আসে। প্রথমটি গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স: কেউ যদি অতীতে গিয়ে তার পিতামহ-মাতামহের বিবাহ ভণ্ডুল করে দেয়, তাহলে তার পিতামাতার জন্ম হবে না, ফলে তার নিজেরও জন্মানোর কথা নয়। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, তার জন্মই যদি না হয়, তাহলে অতীতে গিয়ে এই কাজটি করল কে? দ্বিতীয়টি হলো বুটস্ট্র্যাপ প্যারাডক্স: কেউ ভবিষ্যৎ থেকে শেক্সপিয়ারের একটি নাটকের বই এনে অতীতে তরুণ শেক্সপিয়ারকে দেয়, এবং তিনি সেটি নিজের নামে প্রকাশ করেন। এই অবস্থায় প্রকৃত রচয়িতা কে এবং প্রকাশের প্রকৃত তারিখ কোনটি—এটি এক বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন।
পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সময় ভ্রমণ তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব, তবে তা শুধুমাত্র ভবিষ্যতের অভিমুখেই। আইনস্টাইনের 'আপেক্ষিকতার তত্ত্ব' বলছে, সময় কোনো স্থির বিষয় নয়; গতি ও মহাকর্ষের প্রভাবে এর গতি ধীর বা দ্রুততর হয়, যাকে টাইম ডাইলেশন বলে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে থাকা নভোচারীরা প্রচণ্ড গতিতে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেন, যে কারণে মাটিতে থাকা মানুষের চেয়ে তাদের সময় কিছুটা মন্থর হয়। রাশিয়ার খ্যাতিমান নভোচারী সার্গেই ক্রিকালিয়েভ ৮০৩ দিন মহাকাশে অতিবাহিত করার পর ফিরে গাণিতিক হিসাবে পৃথিবীর সাধারণ মানুষের তুলনায় ০.০২ সেকেন্ড ভবিষ্যতে পৌঁছে গিয়েছিলেন—এটি বিজ্ঞানসম্মত সত্যি।
তবে অতীতে যাত্রা করা অথবা কোনো সময়ের চক্রে আটকে যাওয়ার বিষয়টি বাস্তবেই অত্যন্ত জটিল। 'ওয়ার্মহোল' নামের মহাজাগতিক সুরঙ্গ ব্যবহারের তাত্ত্বিক ধারণা থাকলেও, বিজ্ঞানীরা এটিকে বাস্তবে অসম্ভবই মনে করেন। প্রখ্যাত পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং 'ক্রোনোলজি প্রটেকশন কনজেকচার' নামে একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তার মতে, অতীত ভ্রমণের ফলে যে বিভাজন সৃষ্টি হতে পারে, তা থেকে মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রকৃতি নিজেই পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র দিয়ে সেই পথ রুদ্ধ করে রেখেছে। টাইম ট্রাভেল ও টাইম লুপ নিছক সিনেমার অনুষঙ্গ নয়; এগুলো মানুষের ভুল সংশোধনের অদম্য আকাঙ্ক্ষা ও জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের মূল্য নিয়ে গভীর ভাবনার জন্ম দেয়। অতীতে ফিরে ভুল শোধরানো বা ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের এই চিরন্তন চাওয়া হয়তো অপ্রাপ্য, কিন্তু কল্পনা ও বিজ্ঞানের এই সংমিশ্রণ মানব মনকে চিরকাল রোমাঞ্চিত করে রাখবে।




