চীনের বিজ্ঞানীরা পারমাণবিক ফিউশন বা 'কৃত্রিম সূর্য' তৈরির প্রযুক্তিতে এক যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছেন। তাঁরা সম্প্রতি একটি ৫৮২ মেট্রিক টন ওজনের বিশালাকার অতিপরিবারর চুম্বকের সফল পরীক্ষা চালিয়েছেন, যা এই প্রকল্পের জন্য নির্মিত এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় চুম্বক। হেফেই শহরের ইনস্টিটিউট অব প্লাজমা ফিজিকসে গত ২৭ জুন এই ঐতিহাসিক পরীক্ষাটি সম্পন্ন হয়।

এই দানবীয় চুম্বকটির দৈর্ঘ্য ২১ মিটার ও প্রস্থ ১২ মিটার এবং এর চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি প্রায় ৬.৫ টেসলা, যা একটি সাধারণ এমআরআই মেশিনের চুম্বকের তুলনায় দুই থেকে চার গুণ বেশি। ফ্রান্সে নির্মাণাধীন আন্তর্জাতিক ফিউশন প্রকল্প আইটিইআরের চুম্বকের চেয়েও এটি আয়তনে ১.৩ গুণ বড় এবং প্রায় তিন গুণ বেশি শক্তি ধরে রাখতে সক্ষম। এই চুম্বক নির্মাণে ছয় বছর সময় এবং ৪৭টি নতুন পেটেন্টের প্রয়োজন হয়েছে।

মূলত, সূর্যের শক্তির উৎসকে অনুকরণ করাই এই 'কৃত্রিম সূর্যের' উদ্দেশ্য। সূর্যের কেন্দ্রে প্রায় দেড় কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় হাইড্রোজেন পরমাণুগুলা পরস্পরের সঙ্গে মিশে হিলিয়াম তৈরি করে, যার ফলে বিপুল শক্তি নির্গত হয়। পৃথিবীতে এই নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রক্রিয়া ঘটাতে হলে সূর্যের কেন্দ্রের থেকেও সাত গুণ বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা প্রয়োজন। তবে কোনো ধাতু বা পদার্থ এত তাপ ধরে রাখতে পারে না, কারণ এত উত্তাপে সবকিছুই বাষ্পীভূত হয়ে যায়।

এই সমস্যা সমাধানে বিজ্ঞানীরা 'টোকামাক' নামক এক বিশেষ ধরনের ডোনাট-আকৃতির চৌম্বকীয় খাঁচা ব্যবহার করেন। এই ব্যবস্থায় প্রচণ্ড শক্তির চুম্বকের মাধ্যমে একটি অদৃশ্য পাত্র তৈরি করা হয়, যার মধ্যে প্লিজমা বা অতিউত্তপ্ত আয়নিত গ্যাস ভেসে থাকে, কোনো পাত্রের গায়ে না লেগেই। চীনের তৈরি এই সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বকটি সেই চৌম্বকীয় খাঁচার মূল উপাদান। এগুলোর মধ্যে ১৬টি কুণ্ডলী মিলে একটি সম্পূর্ণ চুম্বক তৈরি করবে, যা ২০২৭ সালের মধ্যে 'বেস্ট' বা বিআরনিং প্লাজমা এক্সপেরিমেন্টাল সুপারকন্ডাক্টিং টোকামাক নামে একটি নত্জন প্রজন্মের রিঅ্যাক্টরে স্থাপন করা হবে।

পারম্পরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফিশন পদ্ধতিতে পরমাণু ভেঙে শক্তি উৎপাদন করা হয়, কিন্তু ফিউশনে পরমাণু জোড়া লাগানো হয়, যা অপরসীম নিরাপদ। এটি কোনো চেইন বিক্রিয়া নয়; তাপমাত্রা কমে গেলে বা কোনো ত্রুটি হলে বিক্রিয়া নিজেই বন্ধ হয়ে যায়, চেরনোবিলের মতো দুর্ঘটনার কোনো ঝুঁকি থাকে না। ফিউশনের জ্বালানি হিসেবে সমুদ্রের পানি থেকি হাইড্রোজেনের আইসোটোপ ব্যবহার করা সম্ভব, ফলে এটি কার্বন নির্গমনবিহীন এবং পরিবেশবান্ধব।

বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডাটা সেন্টার ও বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রসারে ভবিষ্যতে বিদ্যুতের চাহিদা বিপুলহারে বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফিউশন শক্তি এই চাহিদা মেটানোর একমাত্র টেকসই পথ হতে পারে। সৌরবিদ্যুতের বাজারের মতো ফিউশন শক্তির হার্ডওয়্যার ও সরবরাহ শৃঙ্খলও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাচ্ছে চীন। যদিও বাণিজ্যিকভাবে গ্রিডে ফিউশন বিদ্যুৎ যুক্ত হতে ২০৪০ বা ২০৫০ সাল পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। বিজ্ঞানীদের একটি অংশ ২০৩০ সালের দিকে পরীক্ষামূলকভাবে এ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও, এখনই নিশ্চিত সাফল্যের কথা বলা যাচ্ছে না। তারপরও এই চুম্বক নির্মাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি পদক্ষেপ, অনেকটা জেট ইঞ্জিনের নিখুঁত টারবাইন ব্লেড তৈরি করার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অর্জন।